মাছরাঙার প্রতিবেদন শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছে

একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জিপিএ ফাইভ পাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীকে সামাজিক নিগ্রহের কবলে ফেলেছে বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশন মাছরাঙা টিভি। এ প্রতিবেদন বিষয়ে দেশের তরুণ সাংবাদিকদের ভাবনার অংশ হিসেবে এই লেখাটি প্রকাশ হয়েছে। লেখক বর্তমানে দৈনিক সমকালে কর্মরত।

আবু সালেহ রনি

গত ৩০ মে মাছরাঙা টেলিভিশনে ‘জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ১৩ জন শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎকার’ নিয়ে প্রচারিত সংবাদ নিয়ে গণমাধ্যমের নৈতিকতার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। এ ঘটনা এবারই যে প্রথম তা নয়, আগেও গণমাধ্যমে এ ধরনের ঘটনার নজির রয়েছে। এখন দেখা যাক মাছরাঙার ওই প্রতিবেদনে ‘গণমাধ্যম প্রশ্নবিদ্ধ’ হয়েছে কি-না ?

যদিও মাছরাঙা টেলিভিশনে ওই সংবাদ নিয়ে প্রচারের পর বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি মিডিয়া পাড়ায় নানা ধরনের গুঞ্জন চাউর হয়েছে। অনেকে দাবি করছেন প্রতিবেদনটি তৈরির সময় শিশু শিক্ষার্থীদের মুখগুলো ঝাপসা করা ছিল, কিন্তু Ronyঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সেই ঝাপসা মুখগুলোকে দর্শকের কাছে প্রকাশ্য করে দেওয়া হয়েছে। এখানে বলে রাখা উচিত- দেশের আইন অনুসারে ১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু। যদিও অনেকের কাছে এটা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। তবে আমি মনে করি, কিছু ব্যতিত্রক্রম ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে প্রণীত দেশের আইনে যা থাকবে, সেটাই সবাইকে মান্য করতে হবে। মাছরাঙায় যে ১৩ জন শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়েছে, ধারণা করা যায় তাদের বয়স ১৮ বছরের নিচেই হবে।

বলে রাখা ভালো প্রিন্ট মিডিয়ায় পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকলেও টেলিভিশন সংবাদিকতায় আমার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে দুই বছর মেয়াদী পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা করার সময় আমাদের ‘টেলিভিশন সাংবদিকতা’ নিয়ে একটি বিষয় পড়তে হয়েছিল। সেখানে প্রতিবেদন তৈরি থেকে শুরু করে প্রচার পর্যন্ত সীমিত আকারে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। সেই সামান্য অভিজ্ঞতা নিয়েই মাছরাঙার প্রতিবেদনটি প্রকাশের ক্ষেত্রে দুর্বল দিক তুলে ধরার দুঃসাহস দেখালাম, কিছু প্রশ্ন তুলে ধরার চেষ্টা থাকলো।

এবার আসি মূল কথায়, মাছরাঙার ওই প্রতিবেদনটির উদ্দেশ্যে নিয়ে। প্রতিবেদনে জিপিএ-৫ যেভাবে বাড়ছে, সে তুলনায় শিক্ষার মান আদৌ বাড়ছে কি-না, সেটা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের উদ্দেশ্যে চমৎকার। কিন্তু তাহলে প্রশ্ন কেন? তার কারণ সাংবাদিক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চমৎকার উদ্দেশ্যের চেয়ে প্রতিবেদনে চটকদারী মনোভাবকে অতিমাত্রায় প্রাধান্য দিয়েছেন।

অস্পষ্ট তথ্য

প্রতিবেদনের শুরুতে ‘কয়েকজন শিক্ষার্থীর’ কথা বলা হলেও একটি অংশে ১৩ জন শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আমার প্রশ্ন এই ১৩ জন শিশু বাছাই করতে গিয়ে আর কতগুলো শিশুর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল। যদি ধরে নেই ১৩ শিক্ষার্থীর বাইরে কারও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়নি, তাহলে প্রশ্ন- এরা কোথায় পড়াশোনা করছে, তারা শহরাঞ্চলের না অজপাড়া গাঁয়ের। আচ্ছা দর্শক হিসেবে প্রশ্ন- যদি ইংরেজি মাধ্যম বা ঢাকার নামিদামি কোনো এলাকা বা স্কুলগুলোর শিশু শিক্ষার্থীদের এভাবে সাক্ষাৎকার নেওয়া হতো, তাহলে ফল কি হতো? ওই শিশুরা যদি সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারত, তাহলে কি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলা হতো যে ‘দেশে শিক্ষার মান আকাশ ছুঁয়েছে?’ সেটি নিশ্চয়ই সাংবাদিক করতেন না। তার দরকার প্রতিবেদনের কাটতি বাড়ানো। ধরে নেওয়া যায় কাটতি বাড়ানোর জন্যই ওই শিক্ষার্থীরা যেসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পেরেছে, সেগুলো প্রচার করা হয়নি। প্রতিবেদনে দেখা যায় একেকজনকে একেক রকম প্রশ্ন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রতিবেদক স্পষ্ট করেননি, শিক্ষার্থীদের কাকে কতগুলো প্রশ্ন করা হয়েছিল। তাদের কেউই একটি প্রশ্নেরও সঠিক উত্তর দিতে পারেনি- এমন কিছু জানাননি।

সাংবাদিক না স্যার?

প্রতিবেদনে দেখা যায় শিক্ষার্থীরা সাংবাদিককে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করছে। এটা থেকেই স্পষ্ট ওই শিক্ষার্থীরা ঘাবড়ে গিয়েছিল। তাদের বেশভূষা দেখে মনে হয় তাদের টেলিভিশনে দেখানো হবে এমন প্রলোভন দিয়ে আনা হয়েছে এবং তারাও বেশ পরিপাটি সাজে এসেছে। ধারণা করা যায়, প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় শিশুরা যে উত্তরগুলো পারেনি, সেটাই তুলে ধরা হয়েছে। এটা ওই শিশুদের মনে কি পরিমাণ বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে, সেটা অনুধাবন করা সত্যি কঠিন। এই প্রতিবেদন ওই শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছে। সারা জীবন হয়তো এই শিশুরা আস্থাহীনতায় ভুগবে। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও হয়তো তাদের নিগৃহীত হতে হবে।

ক্যামেরার সামনে প্রথম দাঁড়িয়ে যে কারও কিছুটা ঘাবড়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। এই শিশুদের ক্ষেত্রে এমনটা হয়নি- এটা কি নিশ্চিত করে বলা যাবে? এর দায় কে নেবে? এদের মধ্যে যদি কেউ বিষণ্নতায় ডুবে গিয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে কিংবা আরও খারাপ কিছু ঘটায়, সেটাও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। একই শিশুকে একাধিকবার প্রশ্ন করে বারবার প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছে, এই শিশুরা কিছুই জানে না। কিন্তু এটা কি হতে পারে? ওই শিক্ষার্থীরা জিপিএ-৫ না পেলেও কাছাকাছি ফল তো নিশ্চয়ই পেত। সংবেদনশীলতা বিবেচনায় অন্তত শিশুদের মুখগুলো ঝাপসা করে প্রকাশ করা যেত।

স্কুল কর্তৃপক্ষ

শিক্ষার মান নিয়ে যদি প্রশ্ন ওঠে তাহলে তার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষা ব্যবস্থাই দায়ী। কারণ এমসিকিউ (মাল্টিপল চয়েস কোশ্চেন) পদ্ধতিতে শিশুদের উত্তর বাছাই করতে বলা হয়! সরাসরি উত্তর দিতে বলা হয় না, তাই নয় কি? প্রতিবেদনে শিক্ষা ব্যবস্থা, এমসিকিউ পদ্ধতি,পাঠ্যসূচি নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত ছিলো।

কারণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সাংবাদিক প্রশ্নের ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ ও বিজ্ঞান বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন। এই শিশুরা কোথায় পড়েছে, তাদের স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও বক্তব্য নেওয়া যেত। শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটির কারণেই যে শিশুরা প্রশেুর উত্তরগুলো দিতে পারেনি প্রতিবেদনে তা দুর্বলভাবে এসেছে। যে দুইজন বিশেষজ্ঞের বক্তব্য দিয়ে প্রতিবেদনটি শেষ করা হয়েছে তা আরও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ তারা স্কুলে ওই শিশুদের পড়াননি। বিশেষজ্ঞদের মতামতের পাশাপাশি ১৩ শিক্ষার্থীর সংশিষ্ট স্কুল কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদের কাছেও এর সমাধান চাওয়া উচিত ছিলো। সেটা করলে অন্তত পাঠ্যসূচির ঘাটতির বিষয়টি উঠে আসতো। অবশ্যই এত কিছু এক প্রতিবেদনে প্রকাশের ঝক্কিও কম নয়।

আত্মপক্ষ

শিক্ষার মান কমছে- এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। পরীক্ষার আগে প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যায়, জাতিকে মেধাহীন করতে জঘন্যতম অপরাধের জন্য কোনো বিচার হয় না, সরকার শুধু হুংকার দেয়, মাধ্যমিক পর্যায়ে যখন গ্রেডিং চালু হয়, তখন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী হাজারে সীমাবদ্ধ ছিলো। আর এখন সেটি লাখ ছুঁয়ে যায়, পাশের হারও ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। গত বছরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে ইংরেজি বিষয়ে অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীরা গণহারে ফেল করেছে। বহুল আলোচিত এ ঘটনায় তখনও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। প্রতিবেদনটি সেখান থেকে শুরু করে এর নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধান করলে হয়ত দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনতো।

পরিশেষ

সার্বিক পরিস্থিতিতে এটা সহজেই অনুমান করা যায় শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঠামোগত ফাঁকি রয়েছে। নম্বর বাড়ানোর কৌশল ব্যবহার করছে শিশুরা। শিক্ষা এখন ব্যবসা। এই ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি রোধ করে সংশিষ্টদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। কয়েক বছর আগের কথা আমার পরিচিত এক ছেলের দুই ভাই ঢাকায় এসেছিল বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং করতে। দেখা হওয়ার পর দুই ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে দেখলাম একটি খুব চঞ্চল; অপরটি একেবারে বিপরীত। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রসঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে আমি বইয়ের বাইরে গিয়ে কিছু প্রশ্ন করলাম। দেখি সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা সম্পর্কে তারা জানে না, আগ্রহ নেই। কথায় কথায় মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন করলাম। এক পর্যায়ে আমি নিজেও খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলাম শিক্ষার মান নিয়ে।

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ- এটা পৃথিবীর সৃষ্টিকাল থেকে প্রতিষ্ঠিত সত্য। আজ যারা শিশু তাদেরকে যদি আমরা সুস্থ্য-সুন্দর পরিবেশে বিকাশ লাভের সুযোগ করে দিই, তাহলে ভবিষ্যতে তারা হবে এদেশের সুযোগ্য নাগরিক। কিন্তু সত্য হচ্ছে শিশুদের বড় একটি অংশ বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে খুবই উদাসীন। খবর দেখে না, পত্রিকাও পড়ে না। গ্রামাঞ্চলেও এখন মহামারী হয়ে দেখা দিয়েছে ‘ফেইসবুক’। গুজব নির্ভর এ জাতির ভবিষ্যৎ গড়তে শিশুদের সঠিক শিক্ষা দিতে হবে। আর সেটা নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকেই।

Advertisements

মন্তব্য?

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s