মাহফুজ আনামকে স্যালুট

মাহফুজ আনাম-ডিজিএফআই ইস্যুতে দেশের তরুণ সাংবাদিকদের ভাবনার অংশ হিসেবে এই লেখাটি প্রকাশ হয়েছে। লেখক বর্তমানে চ্যানেল ২৪-এ কর্মরত।

আমীন আল রশীদ

এক-এগারো বা ওয়ান-ইলেভেন; নাম যাই হোক, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনোদ্দীনের (ইয়াজউদ্দিন, ফখরুদ্দীন, মঈনুদ্দীন) সরকার ও তাদের কর্মকাণ্ড বহু বছর আলোচিত হবে।

আমীন আল রশীদ
আমীন আল রশীদ

ওই সময়ে আমি কাজ করি দৈনিক যায়যায়দিনে, যার সম্পাদক ছিলেন শফিক রেহমান, যিনি সরাসরি বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত না থাকলেও বেগম জিয়ার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে ধরে নেয়া হয় যে,তিনি বিএনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবী। স্বভাবতই আর্মি ব্যাকড বা সেনা সমর্থিত ওই সরকারের আমলে যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নজরদারির আওতায় আসে, শফিক রেহমান ও যায়যায়দিনও তার ব্যতিক্রম ছিল না।

ওই সময়ে গণমাধ্যমের ওপর সরকারের বা সামরিক বাহিনীর কী ধরনের প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ ছিল তা খুব বেশি ভেঙে বলার সুযোগ নেই।বিশেষ করে সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী ডিজিএফআইয়ের পাঠানো চোথা (গ্রেফতার রাজনৈতিক নেতাদের তথাকথিত জবানবন্দি) ছাপানো অনেকটা বাধ্যতামূলক ছিল এবং ওই জবানবন্দি কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই যে সম্পাদকরা ছাপতে বাধ্য হতেন, সেটি সম্প্রতি স্বীকার করে অনেকের তোপের মুখে পড়েছেন ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম।

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজের একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন,ওয়ান ইলেভেনের পরে অনেক রাজনৈতিক নেতার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি তারা কোনোরকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই ছাপতে বাধ্য হয়েছিলেন। এক্ষেত্রে সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী ডিজিএফআইয়ের চাপের কথা তিনি উল্লেখ করেন।

জনাব মাহফুজ আনামের ওই বক্তব্য নিয়ে পুরো মিডিয়া অঙ্গন তো বটেই উত্তাপ ছড়িয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে এমনকি খোদ জাতীয় সংসদেও। রোববার রাতে অনির্ধারিত আলোচনা বা পয়েন্ট অব অর্ডারে কয়েকজন সংসদ সদস্য ওই ঘটনায় মাহফুজ আনামের পদত্যাগ দাবি করেছেন। কেউ কেউ ডেইলি স্টার বন্ধেরও দাবি তুলেছেন। শুধু তাই নয়, এর আগে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে এবং তার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, মাহফুজ আনামকে গ্রেপ্তার করা উচিত।

একটি তিক্ত সত্যি স্বীকারের মধ্য দিয়ে মাহফুজ আনাম এক-এগারো পরবর্তী যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন, সেজন্য তাকে আমাদের ধন্যবাদ দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে অনেকে তার গ্রেপ্তারের দাবি তুলছেন।

ওই সময়ে ইংরেজি দৈনিক নিউএজ এবং বাংলা পত্রিকা যায়যায়দিন ছাড়া মোটামুটি সবাই ডিজিএফআইয়ের পাঠানো চোথা ছাপতে বাধ্য হয়েছিল। যারা ছাপেনি তারাও কী ধরনের ভয়-ভীতির মধ্যে ছিলো, তা যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তারা জানেন।

মাহফুজ আনাম ছাড়াও যেসব সম্পাদক ওই ভয়াবহ সময়ের সাক্ষী, তাদের কেউই আজ পর্যআন্ত সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর ওই তৎপরতার বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি বা খোলার সাহস পাননি। সেই জায়গায় মাহফুজ আনাম যে ঝুঁকি নিয়ে সত্যটি স্বীকার করেছেন,তাতে তাকে সংবর্ধনা দেয়া উচিত। মাহফুজ আনাম সত্য বলার বা ‘অপরাধ’ স্বীকারের যে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করলেন, তাতে তার প্রতি আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা অনেক বেড়ে গেছে।

এই সময়ে যারা সাংবাদিকতা পেশায় আসতে চান, তাদের সামনে ওই অর্থে এখন কোনো আদর্শ নেই। আমরাও যাদের আদর্শে মনে করতাম, তাদের অনেকের নৈতিক স্খলন আর কিছু ব্যক্তিস্বার্থের কাছে নিজেদের বিকিয়ে দেয়ার প্রবণতা দেখে দেখে যখন হতাশ হয়ে পড়ি, তখন মাহফুজ আনাম কিছুটা আশার আলো দেখালেন। স্যালুট আপনাকে।

আর যেসব রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সংসদ সদস্য মাহফুজ আনামের গ্রেপ্তার বা বিচার দাবি করছেন, তাদের উদ্দেশে বলি, ওয়ান-ইলেভেন এসেছে আপনাদের কারণেই। মাহফুজ আনামরা ওয়ান-ইলেভেন আনেননি। আপনাদের সীমাহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর অসহিষ্ণুতার ফল ওয়ান-ইলেভেন। যে দেশের রাজনীতিবিদরা সৎ, দেশপ্রেমিক- সেদেশের সেনাবাহিনী ভুলেও রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে না।সুতরাং যাদের কারণে ওয়ান-ইলেভেন এসেছে এবং যারা ওই সময়ে রাজনৈতিক নেতা ও শিক্ষকদের ধরে নিয়ে নির্যাাতন চালিয়ে তথাকথিত জবানবন্দি আদায় করেছে, ক্ষমতা থাকলে তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনুন।


Advertisements

মন্তব্য?

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s