পুলিশের আগুনে বাবুলের মৃত্যু: দায়িত্বহীন ‘সময়ের কণ্ঠস্বরে’ অনৈতিক এক ছবি

মাসচারেক আগে অনৈতিক ‘প্রতীকী ছবি’ ব্যবহার করে দর্শকের কাছে ক্ষমা চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর এক টেলিভিশন স্টেশন। ইহুদিদের এক ধর্মী দিবস নিয়ে অনুষ্ঠান প্রচার করছিলো ডব্লিউজিএন নামের স্টেশনটি। WGN-Jewঅনুষ্ঠানটি যে ইহুদিদের নিয়ে তা ভিজ্যুয়াল দিয়ে টিভি স্ক্রিনে তুলে ধরতে গিয়ে তারা দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয়। স্টেশনটি স্ক্রিনে সেই তারা আকৃতির ব্যাজটি প্রচার করেছিলো যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিদের পড়ে থাকতে বাধ্য করতো নাৎসী বাহিনী।

বাংলাদেশে কদিন আগেডব্লিউজিএন-এর চেয়ে ভয়ঙ্কর দায়িত্বহীনতা ও অনৈতিকতার পরিচয় দিলো অনলাইন ‘সময়ের কণ্ঠস্বর’। ঢাকার মিরপুরে পুলিশের লাঠির আঘাতে চুলা থেকে আগুন লেগে চা-দোকানি বাবুল মাতু্ব্বরের মৃত্যু হয় ৫ ফেব্রুয়ারি। তার গায়ে আগুন লাগার ঘটনাটি ঘটে ৩ ফেব্রুয়ারি।

খবরটি সংবাদমাধ্যমে আসে এর পরদিন। মূলধারার সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ২৪ডটকম ও প্রথম আলোর পাশাপাশি একাধিক অনলাইনেও খবরটি প্রকাশ হয় হয় ৪ ফেব্রুয়ারি।

S Kntha-2
সময়ের কণ্ঠস্বরের ফেইসবুক পেইজে অনৈতিক ছবিসম্বলিত খবরটি লাইক পায় ৪৪,০০০।

এই খবর প্রকাশ করতে গিয়ে চরম দায়িত্বহীন ও অনৈতিক একটি কাজ করেছে ‘সময়ের কণ্ঠস্বর’ নামের অনলাইনটি। ফেইসবুকে লাইক সংখ্যায় শীর্ষে থাকা এই অনলাইনটি খবরের ভেতরে একটি ছবি ব্যবহার করে যাতে দেখা যায় একজন মানুষের গায়ে আগুন জ্বলছে। ছবিটির ওপর তারা অবশ্য প্রায় অন্ধকার এক কোণে, নিচে বাম পাশে, লিখে দেয় ‘প্রতীকী ছবি’; যা প্রথম দর্শনে পাঠকের নজর এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এই শব্দ দুটি লিখে এরকম স্পর্শকাতর ছবি ব্যবহার করাটা চরম দায়িত্বহীনতা ও অনৈতিকতার প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়।

গায়ে আগুন-জ্বলতে-থাকা মানুষের ওই ছবিটি পাঠকের সংবেদনশীলতাকে আক্রান্ত করে। অথচ বাংলাদেশে সাংবাদিকদের জন্য যে কোড অব প্র্যাকটিস রয়েছে তাতে বলা হয়েছে, “জনগণকে আকর্ষণ করে অথবা তাঁদের উপর প্রভাব ফেলে এমন বিষয়ে জনগণকে অবহিত রাখা একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব।” কিন্তু এই অবহিত রাখার কাজটি করার সময় পাঠকের দুটি বিষয় সাংবাদিককে বিবেচনায় রাখার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে ওই কোড অব প্র্যাকটিসে। বলা হয়েছে, “জনগণের তথা সংবাদপত্রের পাঠকগণের ব্যক্তিগত অধিকার ও সংবেদনশীলতার প্রতি পূর্ণ সম্মানবোধসহ সংবাদ ও সংবাদভাষ্য রচনা ও প্রকাশ” করার কথা।

সাংবাদিকদের জন্য অনুসরণীয় এই আচরণ বিধি বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল তৈরি করে ২০০২ সালে। তখনও পৃথিবীতে ফেইসবুক আসেনি, আর বাংলাদেশে অনলাইনের জয়জয়কারও শুরু হয়নি।

ছবিতে নজরে-পড়ে-না এমন জায়গায় ‘প্রতীকী ছবি’ লিখলেও ছবিটি কোথাকার তা ক্যাপশনে লেখেনি ‘সময়ের কণ্ঠস্বর’। লেখা মানেই ব্যাখ্যা দেয়া, আর এতে তো ছবির ‘আবেদন’ কমে যাওয়ার আশঙ্কা! তাই ছবির কোনো ক্যাপশন নেই। যদিও ছবির মাঝ বরাবর বাম থেকে ডান পর্যন্ত ‘সময়ের কণ্ঠস্বর’ লোগো ঠিকই সেঁটে দেয়া হয়েছিলো! অথচ সাধারণত এভাবে লোগো দেয়া হয়ে থাকে কোনো সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব ছবির ক্ষেত্রে, যাতে অন্য কেউ ছবিটি ব্যবহার করতে না পারে।

আসলে এটি পাঠকের সংবেদনশীলতাকে পুঁজি করে ওয়েবসাইটে ‘ক্লিক’ বাড়ানোর একটি কৌশল। এ কারণে ‘সময়ের কণ্ঠস্বর’-এর ওই খবরটি তাদের ওয়েবসাইট থেকে ফেইসবুকে শেয়ার হয় সাড়ে চার হাজার বার। লাইক পায় ৩৬,০০০। একই ছবি তারা ব্যবহার করে তাদের ফেইবুক পেইজেও। সেখানে তারা লাইক পায় ৪৪,০০০। ফেইসবুক পেইজ থেকে তা শেয়ার হয় সাড়ে আট হাজার বার।

একই খবর মূলধারার সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ২৪ডটকম ও প্রথম আলোয় প্রকাশ হয়েছিলো এভাবে:

Babul-P alo
প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবরের স্ক্রিনশট
Babul- bdnews24
বিডিনিউজ২৪ডটকমে প্রকাশিত খবরের স্ক্রিনশট

‘সময়ের কণ্ঠস্বরে’ ব্যবহৃত ছবিটি আসলে শ্রীলংকায় এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর নিজের গায়ে আগুন দেয়ার ছবি। তিনি পশু জবাইয়ের প্রতিবাদে ২০১৩ সালের ২৪ মে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। এই ছবি ‘প্রতীকী’ হয় কী করে!

শিকাগোর ডব্লিউজিএন দর্শকের কাছে ক্ষমা চাইলেও ‘সময়ের কণ্ঠস্বর’ নিশ্চয়ই এই ছবি সরিয়ে নেবে না। আপনি চাইলে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলে এ বিষয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন এই লিঙ্কে গিয়ে

Advertisements

মন্তব্য?

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s