Shamsur-Rahman

তাকে বাতিলের অধিকার হয়েছে তোমার?

Shamsur-Rahmanলোকটা শেষ দিকে যা লিখেছেন তা পড়া যায় না। তিনি প্রতিদিনকার ঘটনা নিয়ে কবিতা লিখতেন। শেষ বয়সে। ওইগুলি কিছু পড়া যায় না। কার সঙ্গে দেখা হলো, কী করলেন গতকাল সন্ধ্যায় তাই নিয়ে কবিতা। এইভাবে হয় নাকি!

শামসুর রাহমান সম্পর্কে এইসব শোনা যায়। এই শতকের শুরুতে লিখতে শুরু করা এক তরুণ কবি হিসেবে এইসব আমারও কানে আসে। কারা বলে এইসব? বলে তরুণ কবিতচর্চাকারীরাই। এবং দুঃখজনক হলেও সত্যি এই যে বয়স যখন আঠারোর ঘরে তখন একদিন পরিকল্পনাও করে ফেলি আর এক বন্ধুর সাথে। ভাবি কবিকে গিয়ে বলি আপনি এইসব লেখা বন্ধ করুন!

তাহলে ওই যে শামসুরের লেখা পড়া যায় না- এই কথার কি কোনো ভিত্তি আছে? তিনি কি আসলেই শেষ বয়সে এসে বাতিল হয়ে যাওয়া এক কবি?!

পড়ি তার ‘অনর্থক’ একটা কবিতা ‘সুদূরের অনন্য প্রবাসী’। হাতের কাছে আপাতত ‘ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুঁকছে’ বইটা পেয়ে সেখান থেকে কবিতাটির কিছু অংশ :

শহীদ, বলো তো বন্ধু সেই সব দুপুর, গোধূলিবেলা আর
সন্ধ্যারাত, মধ্যরাত মার্কিন মুলুকে
ঢেউ হয়ে স্মৃতিতটে আছড়ে পড়ে কি
কখনও সখনও? বলো, পাতাল ট্রেনের কামরায়
তন্দ্রাচ্ছন্ন মুহূর্তে চকিতে জেগে ওঠো নাকি বিউটি বোর্ডিং
আর লক্ষ্মীবাজারের ঘ্রাণে?

এই কবিতা শামসুরের বন্ধ্, আমাদের প্রবাসী কবি শহীদ কাদরিকে নিয়ে লেখা। নিয়ে লেখা, না মনে করে লেখা? এ সিদ্ধান্ত জানতে কবিতার শেষ পর্যন্ত পড়তে হয় আমাদের।

এই কবিতাটি কি কবির বিরুদ্ধে ওঠা ওই অভিযোগের জবাব দেয়? কিংবা অভিযোগ সত্য বলে প্রমাণ করে?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা নিয়েও এমন কথা তার শেষ বয়সে কিংবা তারও পরে আমাদের বেঁচে থাকার সময়ে চালু হয়ে যায় যে তার কবিতা পড়া যায় না। এ নিয়ে বুদ্ধদেব বসুর একটা কথা আছে। তার কথা হলো রবীন্দ্রনাথ কবিতায় এমন শব্দ ব্যবহার করেন না যেগুলো পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তার কবিতার শব্দগুলি পরস্পরের সঙ্গে বিষম সম্পর্কে প্রবল উজ্জ্বল হয়ে ওঠে না। তাই তার কবিতার শব্দগুলি আলাদাভাবে নিজস্ব পার্সোনালিটি নিয়ে কবিতাকে অতিক্রম করে আলাদা হয়ে পাঠকের চোখের সামনে ধরা পড়ে না। বুদ্ধদেবের মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের কবিতার শব্দগুলি ঢেউয়ের মতো ভেসে ভেসে আসে পাঠকের মনে। আর এক সামগ্রিক অর্থছাপ রেখে যায়।

শামসুরের কবিতাও ওইরকমের সমস্যায় আকুল। আজকালকার, মানে তরুণ কবিরা যেরকম কবিতা পড়তে-লিখতে পছন্দ করে, কবিতার মতো তার কবিতার শব্দে-শব্দে সংঘর্ষে-সংযোগে কোনো অভিঘাত সৃষ্টির প্রচেষ্টা (স্বতস্ফূর্ত কি আরোপিত) নেই। তাই আজকালকার তরুণরা তার কবিতা তেমন পড়ে না। পড়বে না তারা। সেইসব তরুণেরা যারা কবিতা লেখে, কিংবা লেখার চেষ্টা করে। কারণ তারা একধরনের কলাকৌশল জানে কবিতা লেখার। একধরনের কলাকৌশলে তারা অভ্যস্ত। ওই কৌশল পার হয়ে প্রবীণ মহৎ কোনো কবির কবিতার কাছে পৌঁছুবার দক্ষতা-যোগ্যতা সবার নেই।

২.

‘নাগরিক কবি’। তিনি নাগরিক মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা ইত্যাদি ইত্যাদি তার কবিতায় খুব সুন্দর করে তুলে ধরেছেন। এও শোনা যায়। শামসুর বিষয়ক আলোচনায়। ইতিবাচক অর্থেই এই শব্দবন্ধ বলা হয় কবিটি সম্পর্কে।

কিন্তু ‘নাগরিক কবি’ জিনিসটা কী? কবিতা পড়ে কারা? কবিতা লেখে কারা? এই বিশ-একুশ শতকে থেকেও কবিকে ওই শব্দবন্ধে বন্দি করে পার পেয়ে যাবে তার আলোচকরা?! নাগরিক বলতে যদি শুধু শহুরে মানুষকে বোঝানো হয়ে থাকে তাহলে আমাদের জানাতে হবে কবিতা শহুরে মানুষের বাইরে কতোজন পড়ে? আমাদের জানাতে হবে শহুরে মানুষের বাইরে কতোজন ওই কবিতা নামের জিনিসটা লেখে। আর তার চর্চা করে।

আজকে যে-মানুষটি গ্রামে বসে আছে সে কি এই তথাকথিত নাগরিক জীবনের বাইরে থাকে? তার জীবনেও কি আঘাত হানেনি ডেভেলপারের বহুতল ভবনজীবন? তারও জীবনের রক্তে রক্তে মেশার প্রবল প্রচেষ্টায় ঘরে-ঘরে ঢুকে কি পড়েনি স্যাটেলাইট ফ্যাশন-স্টাইল-জীবন? মোবাইল ফোন? তাকেও কি চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে রাখছে না আমাদের এককেন্দ্রিক আধুনিক জীবন?

তবু আমরা আলোচনায়-আলোচনায় বলে যাবো শামসুুর রাহমান ‘নাগরিক কবি’।!

৩.

তার কি কোনো সীমাবদ্ধতা ছিলো না? ছিলো। অন্য আর সব আধুনিক কবির মতোই কবিতার কথনে তিনি আটকে ছিলেন আমি আর তুমিতে। যেমন ওইখানে আটকে আছে এমনকি আমার সমবয়সী কবিতা লিখিয়েরাও।

ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি
গোলাপ নেবো।
গুলবাগিচা বিরান ব’লে হরহামেশা
ফিরে যাবো,
তা’ হবে না দিচ্ছি ব’লে।
ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি
গোলাপ নেবো।

এই কবিতাটি আমরা, ভবিষ্যতের কবিতা লিখিয়েরা এইভাবে পড়তে পারতাম, পড়তে পারি:

ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার সে
গোলাপ নেবে।
গুলবাগিচা বিরান ব’লে হরহামেশা
ফিরে যাবে,
তা’ হবে না দিচ্ছে ব’লে।
ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার সে
গোলাপ নেবো।

যা তিনি পারেননি (অন্য আর সবার মতোই) তার জন্য তাকে বেদনা দেই না আমি। যা পেরেছেন তার জন্য ভালোবাসায় নত হয়ে থাকি।

আর প্রতিদিনকার ঘটনাকে কবিতায় তুলে আনা? এবং তারও পর কবিতাকে কবিতা করে রাখতে পারা? তা যেদিন পারবো সেদিন নাহয় আমরা আবিষ্কারে বসবো শামসুরের ওইরকম কবিতাগুলির কোনটা সফল, কোনটা ব্যর্থ। তার আগ পর্যন্ত আমাদের কোনো অধিকার নেই শামসুর রাহমানের কবিতাকে বাতিল বলবার।

[২০১০ সালে লেখা। দৈনিক সমকালের সাহিত্য ম্যাগাজিন কালের খেয়ায় প্রকাশ হয়েছিলো।]

Advertisements

মন্তব্য?

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s