Indira-Mujib-Bhutto

মার্কিন তারবার্তা: ৭৫-এর খুনি সরকারকে স্বীকৃতিতে বৃটিশ স্মলম্যানকে পেছনে ফেলেন ভুট্টো

১৫ অগাস্ট ভোরে একদল সেনাসদস্যের হাতে সপরিবারে খুন হলেন বাংলাদেের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেনাবাহিনীর হাত ধরে ক্ষমতায় এলো খন্দকার মোশতাকের সরকার।

সেই খুনি সরকারকে সবার আগে স্বীকৃতি দিলো পাকিস্তান। তবে ওই সরকারকে সবার আগে স্বীকৃতি দেয়ার ইচ্ছা ছিল ঢাকায় তখনকার বৃটিশ হাই কমিশনার ব্যারি জি স্মলম্যানের। এই ইচ্ছার কথা তিনি জানিয়েছিলেন ঢাকায় আমেরিকার তখনকার রাষ্ট্রদূত ইউজেন বোস্টারকে। ওই সরকারকে প্রথম স্বীকৃতি দেয়া দেশগুলোর একটি হোক বৃটেন- বাংলাদেশের নতুন সরকারের মনোভাব বিবেচনা করে, বৃটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই সুপারিশ করার কথা ভাবছিলেন স্মলম্যান।

অবশ্য স্মলম্যানের সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। বৃটেনের আগেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় পাকিস্তান। জুলফিকার আলী ভুট্টোর চার প্যারাগ্রাফের স্বীকৃতি-বিবৃতি আসে ১৬ তারিখ। বিবৃতি শুরু হয় বাংলাদেশের মানুষের জন্য চাল-কাপড় দেয়ার ঘোষণা দিয়ে। এরপর বলা হয়, বাংলাদেশের মানুষের জন্য সাধ্যের মধ্যে যা আছে তাই করতে প্রস্তুত পাকিস্তান। একইসঙ্গে ইসলামি রাষ্ট্র ও তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর প্রতি বাংলাদেশের নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। স্বীকৃতি বার্তার শেষে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন ভুট্টো।

Indira-Mujib-Bhutto
(বাম থেকে) ১৯৭৫ সালে ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো

এরপর সপ্তাহ খানেক কেটে গেলেও খুনি মুশতাক সরকারকে স্বীকৃতির কোনো ঘোষণা আসেনি ইন্ডিয়ার কাছ থেকে। ২২ অগাস্ট এক কনফিডেনশিয়াল তারবার্তায় নয়াদিল্লিতে তখনকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি স্যাক্সবি বলছেন, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ইন্ডিয়া আগের মতোই লেনদেন চালাচ্ছে বলে তারা মনে করছেন। এর পক্ষে যুক্তি হিসাবে তিনি তুলে ধরেছেন দুটি ঘটনাকে: (১) ঢাকায় ইন্ডিয়ার হাই কমিশনে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বার্তা গ্রহণ, (২) নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনারকে গ্রহণ করা। এরই সঙ্গে আরেকটি তথ্য দিচ্ছেন, স্বীকৃতির আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়ার পরিকল্পনা ইন্ডিয়া সরকারের নেই বলে জাপানকে জানিয়েছেন ইন্ডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য কোনো বিবৃতি চাওয়া হয়নি বলেও জানান সচিব।

স্যাক্সবির ২২ তারিখের ওই ইন্ডিয়ান স্বীকৃতির ইঙ্গিতের আগেই লন্ডন থেকে নির্দেশনা পান ঢাকায় হাই কমিশনার স্মলম্যান। ১৮ তারিখে তিনি মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে জানান, তিনি স্বীকৃতির নির্দেশনা পেয়েছেন। তাকে বলা হয়েছে, [সরকারের সঙ্গে] স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্য দিয়ে স্বীকৃতির নীরবে বিষয়টি বুঝিয়ে দেয়া হবে। আর নতুন সরকার যদি তাকে ডাকে তাহলে তার উপস্থিতির মধ্য দিয়ে গোপনে বুঝিয়ে দেয়া হবে। এছাড়া ১৬ অগাস্ট [নতুন] সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে নোটটি পাঠায় তা গ্রহণ করার মধ্যে দিয়েও স্বীকৃতির বিষয়টি প্রকাশ পাবে বলে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে জানান স্মলম্যান। একইদিন ঢাকায় কানাডার চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স বলেন, নতুন সরকার বিষয়ে তার পর্যবেক্ষণ কানাডা সরকারকে জানাতে প্রস্তুত তিনি। এরই সঙ্গে তিনি পরামর্শ দেবেন, [সরকারের সঙ্গে] অফিসিয়াল যোগাযোগ চালিয়ে যাবার যার মাধ্যেম স্বীকৃতি হয়ে যাবে।

১৯ অগাস্ট ঢাকার পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে খুনি সরকারকে স্বীকৃতিদাতা দেশগুলোর একটি তালিকা যায় ওয়াশিংটনে। ঢাকা দূতাবাস থেকে পাঠানো তারবার্তা অনুযায়ী দেশগুলো হলো: পাকিস্তান, সৌদি আরব, সুদান, ইয়েমেন, বৃটেন, মিয়ানমার, জাপান ও জর্ডান।

[লেখাটি ১৯৭৫ সালের অগাস্ট মাসের বিভিন্ন সময়ে ঢাকা, নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদ থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো তারবার্তার ভিত্তিতে তৈরি]

Advertisements

মন্তব্য?

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s