Modi-Bio-P Alo-P Vsion-Epaper-2014-1

সাংবাদিকতা সহজ কাজ-৫ [ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ]

নরেন্দ্র মোদি যখন ছোট ছিলেন তখন তার বাবা রেলস্টেশনে চা বিক্রি করতেন। এমন না যে মোদি এরপর বহুদিন চা-বিক্রি চালিয়ে গেছেন। সে যাই হোক। মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন সুনিশ্চিত- এই অবস্থায় পত্রিকাগুলি এই নিয়ে খবর ছাপলো- চা-বিক্রেতা থেকে প্রধানমন্ত্রী। সেইখানেই এক লাইনে আসলো ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কথা। বাংলাদেশের প্রায় সব পত্রিকাই এই খবর ছাপলো। তবে ফেইসবুকে সমালোচনা শুরু হলো প্রথম আলোর খবর উদ্ধৃত করে। এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর ছেলেও ফেইসবুকে ডাক দিলেন প্রথম আলো বর্জনের।

তারপর বিষয়টি আলোচনায় আসলো আরো ভালো করে। এই সময় কেউ কেউ প্রশ্ন করলেন প্রথম আলো বর্জনের ডাক কেন, খবরটি তো অন্যরাও ছেপেছে- সেগুলি বর্জনের ডাক নেই্ কেন? পাশাপাশি এও বলা হলো ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ তো সতি্যই হয়েছিলো তাহলে আর প্রথম আলো ভুল করলো কিভাবে?

Modi-Bio-P Alo-P Vsion-Epaper-2014-1
‘চা-বিক্রেতা থেকে প্রধানমন্ত্রী’ শিরোনামে প্রথম আলোর আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠায় প্রকাশিত খবরের স্ক্রিনশট

এসব আলোচনার সময় একটা জিনিস আমরা ভুলে যাচ্ছি। আমরা ভুলে যাচ্ছি যে সাংবাদিকতা আসলে এখন সহজ কাজ। মোদি প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। তার একটা আকর্ষণীয় ছোট জীবনী দিতে পারলে ক্ষতি কী। কিন্তু মোদি তো ভারতের মানুষ। তার জীবনী আমরা ভালোভাবে জানি না। অসুবিধা কী। ভারতের ইংরেজি ভাষার কোনো সোর্স থেকে নিয়ে বাংলায় অনুবাদ করে ছাপলেই তো হয়। সহজ কাজ। হলোও তাই। ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ নির্দ্বিধায় লিখে ছেপেও ফেললেন আমাদের সাংবাদিকরা।

সহজ কাজ সহজে করতে গিয়ে দেশের সাংবাদিকরা পার্সপেক্টিভ বস্তুটা ভুলে গেলেন। তারা ভুলে গেলেন সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ১১টা মানুষ মরলে, এবং ১১ জনের ৩ জন বাংলাদেশি হলে তারা খবরটি কিভাবে প্রকাশ করতেন। তারা ভুলে গেলেন যে তখন ওই খবরের শিরোনাম বাংলােদেশে ‘সৌদিতে দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত’ লেখা হয় না। লেখা হয় ‘সৌদিতে দুর্ঘটনায় ৩ বাংলাদেশি নিহত’। কেন ওইভাবে লেখা হয় শিরোনাম? কারণ পার্সেপক্টিভ- খবরটা বাংলাদেশের মানুষের জন্য ছাপা হচ্ছে। একই খবর সৌদি বা অন্য দেশের মিডিয়ায় আসে ১১ জন নিহতের শিরোনাম নিয়ে।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের যুদ্ধ চলে ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। যুদ্ধের শেষ দিকে (৩ ডিসেম্বর) পাকিস্তান হামলা চালায় ভারতের পশ্চিম সীমান্তের কয়েকটি বিমানঘাঁটিতে। এরপর ভারত-বাংলাদেশ মিলে গঠিত হয় মিত্রবাহিনী। এই বাহিনীর সঙ্গে পূর্ব রণাঙ্গনে পাকিস্তানের যুদ্ধ চলে। আর পশ্চিম রণাঙ্গনে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ চলে ভারতীয় বাহিনীর। ১৬ ডিসেম্বর পূর্ব রণাঙ্গণে পাকিস্তান নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করলো মিত্রবাহিনীর কাছে। একই দিন পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে ভারত।

তাহলে ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধও সত্যিই হয়েছিল। আর সেই যুদ্ধের পর আরএসএসে যোগ দেন মোদি। ভারতের মিডিয়া ওই যুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বলতেই পারে। কারণ তারা ভারতের পার্সপেক্টিভে লিখছে। কিন্তু বাংলাদেশে লেখার সময় আমরাও তাই লিখবো?

সাংবাদিকতা যেহেতু সহজ কাজ তাই আমরা ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধই লিখে ফেলি। এই লিখে ফেলাকে যৌক্তিক করে তোলারও চেষ্টা করি নানাভাবে। কাজটা যদি কঠিন হতো তাহলে আমরা পার্সপেক্টিভ নিয়ে ভাবতাম। এবং ‘১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর’ লিখতাম না। লিখতাম ‘১৯৭১ সালে (৩-১৬ ডিসেম্বর) ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর’।

লেখাটি ২০১৪ সালের ২১ মে লেখা

Advertisements

মন্তব্য?

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s