সুধীর দর্শক, বধীর সাংবাদিক

[আপডেট ২: ২৩ জুন সন্ধ্যা ৬টা ২২: ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির ইউটিউব চ্যানেলে সুধীরের সাক্ষাৎকারের ভিডিওটি পাওয়া যাচ্ছে না। এটি পাওয়া যাবে এখানে]

[আপডেট ২৩ জুন দুপুর ২টা: বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশন সময় সুধীরের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। এই স্টেশনকেও সুধীর বলেছেন, কেউ তার ওপর হামলা চালায়নি। তাকে ধাক্কা দেয়া হয়েছে। এই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে সময় টেলিভিশন সংবাদ প্রকাশ করেছে এই শিরোনামে: ‘কেউ আমাকে আক্রমণ করেনি -সময় সংবাদকে সুধির’।]

ইন্ডিয়ান ক্রিকেট দর্শক সুধীর গৌতমের ওপর কয়েকজন বাংলাদেশি হামলে পড়েছিল। ইন্ডিয়ান মিডিয়ার এই খবর সত্যি নয়- বাংলাদেশের অন্তত দুটি সংবাদমাধ্যম এই দাবি করেছে (এই তালিকায় দৈনিক প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ এবং ঢাকা ট্রিবিউনও আছে দেখতে পাচ্ছি)। একই দাবি করেছে তেমন-প্রচার-নেই এমন দুয়েকটি অনলাইন পোর্টালও।

সুধীরের ওপর হামলার খবর মিথ্যা- এমন খবর প্রকাশ করেছে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং একটি বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশন। অনলাইন সংবাদমাধ্যমটির খবরের সূত্র তার নিজস্ব আলোকচিত্রী, যিনি ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। আর টেলিভিশন স্টেশনটি কথা বলেছে ঘটনার শিকার সুধীরের সঙ্গেই।

Shudhir
ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনে সোমবার রাতে প্রচারিত সুধীর গৌতমের সাক্ষাৎকারের স্ক্রিনশট

অনলাইন মাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের খবরে বলা হয়: “ঘটনাস্থলে থাকা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আলোকচিত্র সাংবাদিক আসিফ মাহমুদ অভি বলেন, সুধীরের উপর শারীরিক আক্রমণের কোনো ঘটনা দেখা যায়নি।

স্টেডিয়ামের ২ ও ৩ নম্বর গেইটের মাঝামাঝিতে সুধীরের অটোরিকশায় ওঠার ছবিও তোলেন অভি।

তিনি বলেন, “খেলা শেষে পৌনে ১২টার পরপরই গেইট দিয়ে বের হওয়ার সময় বাংলাদেশের সমর্থকরা সবাই সুধীর গৌতমকে ঘিরে ‘ভুয়া ভুয়া’ বলছিল। ‘মওকা-মওকা’ বলেও টিটকারি করছিলেন কয়েকজন।”

অভি বলেন, “সুধীর সিএনজি ভাড়া করার চেষ্টা করছিলেন। এ সময় বাংলাদেশ সমর্থকরা তাকে ঘিরে টিপ্পনী কাটতে থাকেন। ভিড় দেখে সেখানে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন পুলিশ সদস্য এসে তাকে ঘিরে রেখে একটি সিএনজি অটোরিকশায় তুলে দেয়। তখন বাংলাদেশ সমর্থকদের বেশ কয়েকজন ‘ভুয়া-ভুয়া’ বলে কিছু দূর অটোরিকশা পেছন পেছন যায়।”

অভি বলেন, “তাকে (সুধীর) শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার মতো কিছুই আমার নজরে পড়েনি।”

সুধীরকে “শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার মতো কিছুই” বিডিনিউজের আলোকচিত্রী অভির নজরে না পড়া মানেই তাকে লাঞ্ছিত করা হয়নি!

ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের খবরটি আরও মজাদার। সেখানে প্রতিবেদক কথা বলেন, সুধীরের সঙ্গে। সুধীর প্রতিবেদককে হিন্দিতে জানান, খেলা শেষে স্টেডিয়ামের ভেতরে তাকে একজন ধাক্কা দেয়। এরপর তিনি দুই নম্বর গেট দিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। সেখানে ভিড় থাকায় তিনি এক নম্বর গেট দিয়ে বেরিয়ে আসেন।

বেরিয়ে একটি সেলুনে (যে সেলুনে সুধীর তার চুল কাটিয়েছিলেন) যান তার ব্যাগ নেবেন বলে। লোকজন তাড়া করায় সেলুনঅলা সেলুনের ঝাঁপ বন্ধ করে দেয়। প্রায় ১০ মিনিট পর বেরুলে আবার একদল মানুষ তাকে তাড়া করে এবং ধাক্কা দেয়।

এসময় তিনি দুজন পুলিশ সদস্যকে দেখতে পান এবং তাদের সহায়তায় একটি সিএনজিতে ওঠেন হোটেলে যাবেন বলে। এসময় লোকজন সিএনজিতে লাঠি দিয়ে পেটায় এবং ঠিল ছোড়ে। এতে সিএনজির পর্দা ছিড়ে যায়।

এসময় ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের সাংবাদিক সুধীরকে প্রশ্ন করেন, কেউ কি আপনাকে মেরেছিল?

সুধীর বলেন, “কেউ আমাকে মারেনি। ধাক্কা দিয়েছিল।”

এই যে কেউ মারেনি, এই যে কেউ সুধীরকে পেটায়নি, এই যে সুধীরের পিটুনি খেয়ে হাসপাতালে যেতে হয়নি এতেই আমরা সাংবাদিকরা, বাংলাদেশের মানুষেরা খুশি নিশ্চয়ই! এবং এ কারণেই ইন্ডিপেন্ডেন্টের ওই সুধীরের খবরের ভিডিও ক্লিপের শিরোনাম হয় ‘No one hit me: Shudhir Gautam’s interview on ‘assault controversy’!

বিডিনিউজ এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন- দুটিরই খবর পড়ে-দেখে মনে হয়েছে, সাংবাদিকরা বাংলাদেশের জন্য দুঃখজনক ঘটনাটিকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন। অথবা তারা বধীর।

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, সুধীরকে মারধর করা হয়নি, এবং তা করা হবেও না। তাকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। ওই ক্রমাগত ধাক্কাধাক্কি এবং ধাওয়া করা, ভিড়ের মধ্যে লোকজন ধাক্কা দিয়ে থাকতেই পারে।

তারপর আবার সুধীরের ভাষ্যমতে সিএনজিতে ওঠার পরেও যে ঢিল ছোড়াছুড়ি- এগুলোও বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে সম্ভব। এত এত দর্শক, তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন করে ফেলতেই পারে।

সেটা স্বীকার করে নিলে আমাদের জাত যাবে না।

Advertisements

মন্তব্য?

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s