ডেইলি স্টার, সম্পাদক পরিষদ, তথ্য মন্ত্রণালয়

সরকার কি সম্পাদক পরিষদকে অকাযর্কর করে তোলার মতো ভুল একটি পদক্ষেপের সূচনা করেছে? পরিষদের একটি বিজ্ঞপ্তির জবাবে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক একটি বিজ্ঞপ্তি পড়ার পর থেকে এ প্রশ্নটিই মাথায় ঘুরছে।

অথচ আওয়ামী লীগের গত মেয়াদ এবং বর্তমান মেয়াদে মোটাদাগে দেশের সংবাদমাধ্যম কিন্তু স্বাধীনই। দলটির কোনো কোনো নেতা-কর্মী হয়তো কোনো কোনো সংবাদপত্র প্রকাশনার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত উদ্যোগে মামলা করেছেন এই সময়ে। এর বাইরে আমরা সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছ থেকে সরকারের তরফ থেকে তাদের স্বাধীনতা হরণের বা স্বাধীনতা হরণের চেষ্টার কোনো অভিযোগ তেমন প্রকাশ্যে শুনিনি।

২.
গতবছরের অগাস্ট মাসে সম্পাদক পরিষদ একবার অভিযোগ তুলেছিল। গত বছর সরকার জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিলে গণমাধ্যমসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ওই নীতিমালা নিয়েই সে বছরের ২০ অগাস্ট একটি বিবৃতি দিয়েছিল সম্পাদক পরিষদ।

‘সম্পাদক পরিষদের উদ্বেগ’ শিরোনামের ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, “সম্প্রতি ঘোষিত জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালাসহ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হবে বলে সম্পাদক পরিষদ উদ্বিগ্ন। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করে সরকার গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে বলে সম্পাদক পরিষদ মনে করে।” এখানে বলে রাখা যেতে পারে, সম্পাদক পরিষদ গঠিত হয়েছিল ২০১৩ সালের ২৫ মে।

তো সেই সম্পাদক পরিষদই এবার একটি বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি। এবারের বক্তব্যবের বিষয় মূলত ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার এবং তাকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সংসদে দেয়া একটি বক্তব্য।

Editors'-Council-Press-Release
সম্পাদক পরিষদের বিজ্ঞপ্তি

দৈনিকটি গত ১১ ফেব্রুয়ারি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরিরের একটি দেয়ালো লাগানো একটি পোস্টারের একটি আলোকচিত্র প্রকাশ করে। ‘ফ্যানাটিকস রেইজ দেয়ার আগলি হেড অ্যাগেইন’ শিরোনামে ওই আলোকচিত্রটি প্রকাশ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে সংসদে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যাচ্ছে, জাতীয় পার্টির এক সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সেদিন বলেন, “এই হিযবুত তাহরীরের পোস্টার ছাপিয়ে যারা এদের মদদ করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

৩.
সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটি মনোযোগ দাবি করে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলা মোটরের এক কোনায় লাগানো, হুবহু সেই পোস্টারটা বিশাল আকারে ছাপিয়ে দেওয়া হল। যে সংগঠন নিষিদ্ধ, সেই সংগঠনের একটি পোস্টার পত্রিকায় ছাপানোর মানে হল, ওই সংগঠনকে সহযোগিতা করা।”

হ্যাঁ, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য ১০০ ভাগ ঠিক না হলেও পুরোপুরি বেঠিক নয়। নিষিদ্ধ হিযবুতের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ না-করে সংগঠনটির প্রচার করা একটি পোস্টার বড় আকারে পত্রিকায় পুনঃপ্রকাশ করে ডেইলি স্টার প্রকারান্তরে হিযবুতের প্রচারে সহায়তাই করেছে। পুরনো সেই কথাটি তো সংবাদকর্মীসহ অনেকেরই নিশ্চয়ই জানা: একটি আলোকচিত্র হাজারটি শব্দের চেয়ে অনেক বেশি কথা বলে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে, তবে হয়েছে উল্টো। ডেইলি স্টার কোনো প্রতিবেদন না ছেপে শুধু পোস্টারটি ছেপেছে। এবং পোস্টারটি ছেপেছ বেশ বড় আকারে। এর ফলে ক্যাপশন এবং শিরোনাম থাকা সত্ত্বেও সেগুলি পোস্টারের মুদ্রিত আকারের চেয়ে অনেক অনেক গুণ ছোট হওয়ায় আলোকচিত্রটি প্রকৃতপক্ষে হিযবুতের প্রচারই করেছে।

সেই বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য একেবারেই অর্থহীন নয়, “বাংলা মোটরের কোন কোণায় একটা পোস্টার পড়ে ছিল, সেটা মানুষজন পড়ত না। নেগেটিভভাবে, পজিটিভভাবে হোক, যেভাকেই লিখুক না কেন, পোস্টার বিশাল আকারে ছাপানো এবং এটা কিন্তু হিযবুত তাহরীরকে একটু মদদ দেওয়ার শামিল বলে আমি মনে করি।” একই বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যও একজন স্বাভাবিক সচেতন মানুষের বক্তব্য বলেই মনে হয়, “আমাদের পত্র-পত্রিকা যখন কোনো জিনিস ছাপায় বা কিছু করে, কোনটা নিষিদ্ধ বা কোনটা নিষিদ্ধ না, কাদের দ্বারা দেশের ক্ষতি পারে এ ধরণের কোনো জিনিস তাদের করা উচিত না।”

৪.
তাই বলে, প্রধানমন্ত্রী কি একটি সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলতে পারেন সংসদ অধিবেশনে? আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা যদি দলটির কোনো সমাবেশে কিংবা দলটির কোনো কমিটির সভায় কোনো সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেন সেটি ততটা আশঙ্কার বিষয় নয়। একটি দলের প্রধান তার দলের কর্মীদের সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলতেই পারেন। কিন্তু একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী একটি দেশের সংসদে দাঁড়িয়ে যখন সে দেশের একটি সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেন তখন তা আশঙ্কাজনক।

PID-Press-Release
তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি

জানি প্রধানমন্ত্রী বলামাত্রই ব্যবস্থা নেয়া হয়ে যায় না। কিন্তু এটা আশঙ্কাজনক এই জন্য যে, প্রধানমন্ত্রীর এই ব্যবস্থা নেয়ার বক্তব্যের পর গণমাধ্যমের কর্মীরা সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে পারেন।

প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্য থেকে জন্ম নেয়া আশঙ্কা থেকে সম্পাদক পরিষদও মুক্ত থাকতে পারেনি। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তারা একটি সভা করে এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছে। একটি বিজ্ঞপ্তিতে তারা বলেছে, “সংবাদপত্র পরিষদ গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদপত্র ও জাতীয় প্রচার মাধ্যমের পক্ষে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। একদিকে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে দায়িত্বরত সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে অন্যদিকে সংবাদপত্র ও প্রচার মাধ্যমের স্বধীনতা খর্ব করার চেষ্টা চলছে।”

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “প্রচার মাধ্যমসহ অন্যান্য পক্ষকে বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়ে অযথা হয়রানি করাটা স্বাধীন গণমাধ্যমের সহায়ক হতে পারে না।”

এতে আরো বলা হয়, “ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি ছবি ছাপানোকে কেন্দ্র করে সংসদে দেওয়া প্রতিক্রিয়া প্রচার মাধ্যমের প্রতি বৈরি মনোভাবেরই প্রকাশ করেছে। যা কোনো সরকারের কাছ থেকে কাম্য নয়।”

বিজ্ঞপ্তিটিতে স্বাক্ষর করেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও ডেইল স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। পরিষদের সভাপতি ও সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার সেসময় দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরপরই তিনি এর বিরোধিতা করেন বলে বিডিনিউজ একটি খবরে প্রকাশ করে।

৫.
গত বছর সম্পাদক পরিষদের বক্তব্যে সরকারের তরফ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে এবার সরকার আর নীরব থাকেনি। পরিষদের বক্তব্যের পরদিনই তথ্য মন্ত্রণালয় একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “সম্পাদক পরিষদের বিবৃতি বাস্তবতা বিবর্জিত, সত্যের অপলাপ, পক্ষপাতমূলক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।”

“গত ৬ বছর ২ মাসে সরকার গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপমূলক কোনো আইন প্রণয়ন করেনি। সংবাদপত্র বা ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার মতো কোনো আইন এ মুহূর্তে দেশে নেই।”

“সরকারের কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল-মহল বা ব্যক্তির মালিকানাধীন সকল গণমাধ্যম সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।”

হ্যাঁ একথা সত্য যে সরকারের কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল-মহল বা ব্যক্তির মালিকানাধীন সব গণমাধ্যম মোটামুটি স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একথা সত্য যে সরকার গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপমূলক কোনো আইন প্রণয়ন করেনি।

কিন্তু সম্পাদক পরিষদের বিবৃতি কোন্ ‘বাস্তবতা বিবর্জিত’? তাতে কোন্ ‘সত্যের অপলাপ’ করা হয়েছে? ওই বিবৃতিতে কিসের বা কার প্রতি পক্ষপাত করা হয়েছ? কেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের মনে হয়েছে ওই বিবৃতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত? এসব প্রশ্নের জবাব একমাত্র তথ্য মন্ত্রণালয়ই দিতে পারে। মন্ত্রণালয়ের তার কাছ থেকে একটি বিস্তারিত ব্যাখ্যা পেলেই বরং আমাদের জন্য ভালো হতো। সম্পাদক পরিষদের ভূলগুলো সহজে আমরা বুঝে নিতে পারতাম।

যে বিষয়টি খুবই চোখে লাগে তা হলো তথ্য মন্ত্রণালয়ের দেয়া বিজ্ঞপ্তিটির শিরোনাম। বিজ্ঞপ্তিটির শিরোনাম হলো: ‘সম্পাদক পরিষদের নামে প্রকাশিত বিবৃতির বিষয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য’। সরকারের একটি মন্ত্রণালয় দেশের সংবাদপত্রের সম্পাদকদের একমাত্র সংগঠনকে এভাবে সম্বোধন করবে তা কল্পনা করতেও বিব্রত লাগে। বিজ্ঞপ্তির এই শিরোনামের অর্থ কী? তথ্য মন্ত্রণালয় কি ওই বিবৃতিকে সম্পাদক পরিষদের বিবৃতি হিসেবে মানতে রাজি নয়?

এখানে কেউ যদি বলেন, পরিষদের সভাপতি ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন না এবং তিনি ওই বিবৃতি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই বাস্তবতায় মন্ত্রণালয় ওই বিবৃতিকে ‘পরিষদের নামে বিবৃতি’ বলতে পারে। সেক্ষেত্রে বলতে হয়, সভাপতির প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে যদি সম্পাদক পরিষদের ওই বিবৃতি বাতিল হয়ে যায় তাহলে মন্ত্রণালয় তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতে পারত। কিন্তু মন্ত্রণালয় তার বিজ্ঞপ্তিতে পরিষদের বিবৃতিটিকে প্রত্যাখ্যান করেনি। বরং তার জবাব দিয়েছে। তাহলে শিরোনামে ‘সম্পাদক পরিষদের নামে বিবৃতি’ শব্দগুলি ব্যবহারের কারণ কী?

Advertisements

মন্তব্য?

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s