মেয়েটির বাবার আত্মহত্যায় পত্রিকাটি বিস্মিত কেন?

আবারো নারী-লাঞ্ছনায় আত্মহত্যার খবর। এই খবর এখন আর নতুন লাগে না বাংলাদেশের মানুষের। তবে ১৬ এপ্রিলের খবরটায় নতুনত্ব আছে। এবার লাঞ্ছনার শিকার মেয়েটি আত্মহত্যা করেননি। করেছেন তার বাবা।

খবরটি পড়ুন নিচে :

মেয়ে লাঞ্ছিত হওয়ার খবরে বাবার আত্মহত্যা!
পিরোজপুর প্রতিনিধি | তারিখ: ১৭-০৪-২০১০

গরিব কৃষক হলেও ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করানো থেকে পিছপা হননি তিনি। একমাত্র মেয়ের প্রতি তাঁর ছিল বাড়তি দরদ। কলেজে পড়ুয়া এই মেয়েকে বখাটেরা লাঞ্ছিত করেছে—এ খবরে বাবা মুষড়ে পড়েন। লোকলজ্জা এবং কষ্ট ও ক্ষোভে শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নেন আত্মহননের পথ। গত বৃহস্পতিবার পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, কাউখালীর ওই কৃষকের মেয়ে পার্শ্ববর্তী স্বরূপকাঠি উপজেলার রাজবাড়ী ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণীতে পড়ে। কলেজে যাওয়া-আসার পথে স্বরূপকাঠির ব্যাসকাঠি গ্রামের বখাটে বাদল হাওলাদার প্রায় এক বছর ধরে মেয়েটিকে উত্ত্যক্ত করছে।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য দেবব্রত রায় জানান, গত বুধবার ওই ছাত্রী কলেজ থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরছিল। পথে স্বরূপকাঠির তালবাড়ী এলাকায় বখাটে বাদল ও তার এক সহযোগী মেয়েটির পথ রোধ করে অশ্লীল কথাবার্তা বলে। লজ্জা ও আতঙ্কে মেয়েটি পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে মেয়েটি তার প্রেমিককে (বরিশাল বিএম কলেজের স্নাতকের ছাত্র) মুঠোফোনে এ ঘটনা জানায়। ছেলেটি ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁর প্রেমিকাকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বখাটেরা ছেলেটিকে পিটিয়ে আহত করে এবং কলেজছাত্রীকে আরেক দফা লাঞ্ছিত করে। এতেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, মেয়েটিকে তারা ওই ঘরে আটকে রাখে। একপর্যায়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা মেয়েটির বড় ভাইকে খবর দিয়ে তাঁর সঙ্গে মেয়েটিকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন।

রাজবাড়ী কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দীপংকর মজুমদার বলন, ‘ঘটনার দিন প্রেমিক ছেলেটি মুঠোফোনে আমাকে জানায়, মেয়েটিকে বখাটেরা লাঞ্ছিত এবং তাকে মারধর করেছে।’

প্রেমিক ছেলেটির ভাই সঞ্জয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ওই ঘটনার পর থেকে তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তাঁর সঙ্গে ওই কলেজছাত্রীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে তিনি শুনেছেন।

মেয়েটির বড় ভাই পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের ছাত্র। গতকাল শুক্রবার বিকেলে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘বোনকে লাঞ্ছিত করার বিষয়টি বাবা সহ্য করতে না পেরে আত্মহৎযা করেছেন। বৃহস্পতিবার মাঠে কাজ করার জন্য বাবা ঘর থেকে বের হন। সেদিন সন্ধ্যায় আমরা খবর পাই, বাবা মাঠের পাশের একটি আমগাছের সঙ্গে গলায় রশি লাগিয়ে আত্মহৎযা করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাবা অপরের জমি চাষ করে সামান্য যা পেতেন, তা দিয়ে আমাদের তিন ভাইবোনের লেখাপড়া চলত।’ বাবার আত্মহৎযার ঘটনায় মামলা করবেন কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে কিছুই বলতে পারছি না।’

কাউখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ. রাজ্জাক মোল্লা জানান, কলেজছাত্রীকে লাঞ্ছিত করার কোনো অভিযোগ কেউ করেনি। ওই ছাত্রীর বাবার আত্মহৎযার ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পিরোজপুর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

লাঞ্ছিত নারী বা তার বাবার আত্মহত্যার বিষয়টি কিভাবে ঠেকানো যেত; সমাজের কী করা উচিত্- এসব বিষয়ে কোনো জ্ঞানগর্ভ কথা এখানে বলা হচ্ছে না।

এই লেখার বিষয় দৈনিক প্রথম আলোয় খবরটির প্রকাশের ধরনে। আরো স্পষ্ট করে বললে খবরটির শিরোনাম নিয়ে প্রশ্ন।

পত্রিকাটির খবরের শিরোনাম ‘মেয়ে লাঞ্ছিত হওয়ার খবরে বাবার আত্মহত্যা !’

এই সংবাদের শিরোনামে আশ্চর্যবোধক চিহ্নটি কেনো? এটি খুব আশ্চর্য হওয়ার মতো ঘটনা- এই কারণে? নাকি অতিদু:খ প্রকাশের চেষ্টা? আমরা যেমন বলি হায় হায় এখন কী হবে! এটাও কি সেইরকম চেষ্টা। কিন্তু পড়লে তো পাঠক হিসেবে এই অনুভূতিই হচ্ছে যে মেয়ের লাঞ্ছনায় বাবার আত্মহত্যা করাটা খুব আশ্চর্যজনক।

এই খবরের শিরোনাম ‘মেয়ে লাঞ্ছিত হওয়ার খবরে বাবার আত্মহত্যা’ হওয়াই কি ভালো ছিলো না?

[২০১০ সালের ১৮ এপ্রিলে লেখা]

Advertisements

মন্তব্য?

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s