ফেইসবুক ‘ফ্রেন্ড’

সোশ্যাল মিডিয়ার যাত্রা এবং জয়জয়কার মাত্র বছর চারেকের ঘটনা। নবীন এই যোগাযোগ মাধ্যমটি কি আমাদের প্রচলিত সামাজিক ধ্যান-ধারণা বদলে দিচ্ছে অলক্ষ্যে? কিংবা এই মাধ্যম কোনো কোনো সামাজিক সংযোগকে যেভাবে সংজ্ঞায়ন করছে তার ফাঁদে পড়ে যাচ্ছি আমরা? এর ফলে রাষ্ট্র-সমাজ-ব্যক্তি জীবনের পারস্পরিক সম্পৃক্ততার নতুন কোনো সংজ্ঞা কি তৈরি হয়ে উঠতে পারে?

এ নিয়ে ভাবার আগে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার একেবারে শুরুর একটি উপাদান জেনে নিতে পারি। আমেরিকার প্রতিরক্ষা বাহিনীর ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রোজেক্টস এজেন্সিজের প্রকল্প ছিলো অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রোজেক্টস এজেন্সি নেটওয়ার্ক (এআরপিএএন)। সেই এআরপিএনএনের রে টমলিনসন প্রথমবারের মতো একাধিক কম্পিউটারের এক নেটওয়ার্কে ইমেইল পাঠাতে সক্ষম হন ১৯৭১ সালে। এর পথ ধরে ১৯৯৬ সালে সবার জন্য এলো ফ্রি ইমেইল সার্ভিস হটমেইল। পরের বছর এলো আরেক ফ্রি ইমেইল সাভির্স ইয়াহু মেইল। এর দশ বছর পর এলো জিমেইল। একাধিক সূত্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখন পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার নয়শ কোটি ইমেইল আদানপ্রদান হয়।

এই ইমেইল মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগকে সহজ করে তুলেছিল। তথ্যের দেওয়া-নেওয়ার সময়কে এনেছিল কমিয়ে। তবে ইমেইল যোগাযোগ মূলত দ্বিপাক্ষিক পর্যায়ের হওয়ায় এটি ব্যক্তির সীমা ছাড়িয়ে যায়নি। যদিও একই মেইল একাধিক ব্যক্তিকে একইসঙ্গে পাঠানো সম্ভব। সম্ভব এর জবাবও একাধিক ব্যক্তিকে একই সঙ্গে পাঠানো। এর ওপর ভিত্তি করে ফ্রি ইমেইল সেবা দাতা প্রতিষ্ঠান ইয়াহু ও জিমেইল চালু করেছিল ‘গ্রুপ’ নামের একটি সেবা। যে সেবার আওতায় একটি মাত্র ইমেইল ঠিকানায় মেইল পাঠালে তা গ্রুপের সবার কাছে চলে যায়। সোশ্যাল ‘শেয়ারের’ এই পদ্ধতিটি জনপ্রিয় ছিল বহুদিন। নির্দিষ্ট করে বললে ফেইসবুকের মতো ওয়েবভিত্তিক ‘শেয়ার’ পদ্ধতি আসার আগ পর্যন্ত।

গ্রুপ মেসেজে শেয়ারের সমস্যা ছিল এই পদ্ধতিতে তথ্য আদান-প্রদানে ব্যবহারকারীকে প্রতিবার ইমেইল খুলতে হয়। একজন জবাব দিলে আগের জবাবগুলি সবসময় পড়ার সুযোগ থাকে না। থাকলেও সেগুলো পড়তে হয় ইমেইল ঠিকানায় লেখা বাক্যগুলির জটিলতা পেরিয়ে। এইসব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে দুই হাজার তিন সালে এলো ওয়েবভিত্তিক মেসেজ সার্ভিস ও নেটওয়ার্কিং সার্ভিস মাই স্পেস। দুই হাজার পাঁচ থেকে আট সালের শুরু পর্যন্ত বিশ্বে এটাই ছিল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ওয়েবসাইট। আট সালের এপ্রিলে মাই স্পেস তার অবস্থান হারাতে শুরু করে ফেইসবুকের কাছে। পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদানের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সহজ ও সাবলীল ইন্টারফেস নিয়ে বিশ্ব জুড়ে রাজত্ব করছে ফেইসবুক।


এই ফেইসবুকই তার প্রবল প্রতাপশালী প্রসারে আমাদের সম্পৃক্ততার প্রচলিত কোনো কোনো ধারণাকে বদলে দিচ্ছে। ইয়াহু বা গুগলের মতোই ফেইসবুকেও গ্রুপ করার সুযোগ আছে। অতিরিক্ত হিসাবে আছে কোনো বিষয় বা ব্যক্তিকে নিয়ে পেইজ তৈরির সুযোগ। এই দুই জায়গাতেই তথ্য দেওয়া-নেওয়া বা ভাব প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। তারপরও এই দুটি পদ্ধতি সেরকম জায়গা করে নিতে পারেনি ব্যক্তি পর্যায়ের ব্যবহারকারীদের মধ্যে। পেইজ পদ্ধতির সুবিধা, বিশেষ করে, নিচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তারা তাদের পণ্য সম্পর্কে জানাতে, গ্রাহককে সেবা দিতে এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করছে। গ্রুপ পদ্ধতিও ব্যবহার হচ্ছে কোনো বিষয়ে মত আদান-প্রদানে।

কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে ফেইসবুকের অন্য একটি কৌশল। যা দূর ভবিষ্যতে আমাদের অন্তত একটি সামাজিক সম্পৃক্ততার নামকরণ নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য করবে বলেই মনে হয়। আর তা হলো ফেইসবুক ‘ফ্রেন্ডস’। ফেইসবুকে কারো সঙ্গে যুক্ত হলে তাকে ফেইসবুক ‘কন্টাক্ট’ হিসাবে চিহ্নিত করে দেয় না আমার সামনে। ফেইসবুক এই ‘কন্টাক্টকে’ বলে ‘ফ্রেন্ড’। যদিও আপনার সঙ্গে আমার সংযুক্তি মানেই বন্ধুত্ব নয়, বরং তা এক ধরনের সংঘবদ্ধতা।

এখন ফেইসবুকে আপনি নিশ্চিত কোনো না কোনো গ্রুপের বা একাধিক গ্রুপের সদস্য। ওই গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে আপনার পারস্পরিক আদান-প্রদান (ইন্টারঅ্যাকশন) কতখানি? তা কি আপনার ফেইসবুক ‘ফ্রেন্ডদের’ সঙ্গে ‘ইন্টারঅ্যাকশনের’ সমতুল্য? নিশ্চিতভাবেই নয়। আর এখানেই ফেইসবুকের কৌশলের সার্থকতা। গ্রুপ বা পেইজে আপনার ‘ইন্টারঅ্যাকশন’ যতখানি তা যে ‘ফ্রেন্ডদের’ সঙ্গে ‘ইন্টারঅ্যাকশনের’ তুলনায় কম হবে তা স্বাভাবিক। তাই আপনার ‘কন্টাক্টদের’ ‘কন্টাক্ট’ না বলে ফেইসবুক বললো তারা আপনার ‘ফ্রেন্ড’। আপনি মনে করতেই পারেন যে, লিঙ্কডইন এক্ষেত্রে এই ভুলটি করেছে। কেননা তারা ‘ফ্রেন্ড’ না বলে আপনার ‘কন্টাক্টদের’ বলছে ‘কানেকশন’ যা ‘কন্টাক্টের’ অনেক কাছাকাছি; এবং ফেইসবুকের চাতুর্যপূর্ণ ‘ফ্রেন্ড’ থেকে অনেক দূরের।

‘কন্টাক্টকে’ ‘ফ্রেন্ড’ বলা চাতুর্য কেন হবে? ইংরেজি ভাষায় দ্বাদশ শতকের আগ থেকে প্রচলিত এই ‘ফ্রেন্ড’ শব্দটি। অভিধান অনুযায়ী এর মানে কয়েকরকম। প্রথমত কেউ একজন আমার প্রতি স্নেহ বা শ্রদ্ধা অনুভব করলে তিনি আমার ‘ফ্রেন্ড’। দ্বিতীয়ত, কেউ একজন যিনি আমার প্রতি শত্রুতার মনোভাব পোষণ করেন না তিনিও আমার ‘ফ্রেন্ড’। এছাড়াও এক ভাবনায় আস্থাশীল এমন মানুষদেরও পরস্পরের প্রতি ‘ফ্রেন্ড’ বলা যেতে পারে। কিংবা কেউ যদি কোনো একটা বিষয়ের ইতিবাচক প্রচারে ভূমিকা রাখেন বা কোনো একটা বিষয়কে পছন্দ করেন তিনিও ওই বিষয়টির ‘ফ্রেন্ড’ বিবেচিত হতে পারেন। এছাড়া আপনি যার সঙ্গ পছন্দ করেন তাকেও আপনার ‘ফ্রেন্ড’ বলতে পারেন।

ফেইসবুকে আমার কয়েকশ ‘ফ্রেন্ড’। ব্যক্তিগত জীবনে কি আমার এতো ‘ফ্রেন্ড’ বা বন্ধু আছে? আমার প্রতি স্নেহ বা শ্রদ্ধার কারণে যাকে আমি বন্ধু বলে ভাবতে পারি সেরকম মানুষ কি কখনো শতশত হওয়া সম্ভব? আমি অবশ্য আপনাকে এ কথাও বলতে পারি যে, আমার শতশত ফেইসবুক বন্ধুরা আমার প্রতি শত্রুভাবাপন্ন নন- তাই তারা আমার বন্ধু। কিন্ত বন্ধু বিষয়টি কি আসলেই এরকম সরল ব্যক্তিক হিসাবে? এই পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ আমার প্রতি শত্রুভাবাপন্ন নন, তাহলে তারা কি আমার বন্ধু; যে অর্থে আমার স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত কয়েকজনকে আমি বন্ধু বলে জানি, সেই অর্থে? কিংবা এই শত শত মানুষের সঙ্গ কি আমি চাই যে কারণে এদের বন্ধু বলতে পারি?

চেনা-অচেনা-অল্প চেনা মানুষদের ফেইসবুকে ‘ফ্রেন্ড’ করে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনাও তো ঘটছে। এর মধ্যে একটির কথা বলা যেতে পারে উদাহরণ হিসাবে। এখানে যে কেউ ইচ্ছা করলে যে কাউকে যে কোনো গ্রুপে যুক্ত করে দিতে পারেন। দেখা গেছে এই ধরনের গ্রুপে যুক্ত করার ক্ষেত্রে যাকে যুক্ত করা হচ্ছে তার মতটা আগে জেনে নেওয়ার সৌজন্য ফেইসবুক ‘ফ্রেন্ডরা’ দেখান না। এরপর সেই ব্যক্তি ওই গ্রুপ ছেড়ে গেলে তাকে তার সেই ‘ফ্রেন্ড’ গালমন্দও করেন! এছাড়া অনাকাঙ্খিত পোস্টে, ছবিতে ‘ট্যাগ’ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে যা ওই ব্যক্তির জন্য বিব্রতকর হতে পারে। এই রকম পরস্থিতির কারণে দেখা গেছে অচেনা-অল্প চেনা মানুষকে ফেইসবুক ‘ফ্রেন্ড’ হিসাবে প্রথম গ্রহণ করার পর অনেকে বাদও দিয়ে দিচ্ছেন সেই ‘ফ্রেন্ডকে’।

ফেইসবুক যে মার্ক যুকেরবার্গ বন্ধুবান্ধবদের খবর ‘শেয়ারের’ জন্য চালু করেছিলেন সেই কথা আমরা ভুলে যাইনি। তাই ফেইসবুকের এই ‘ফ্রেন্ড’ কৌশলকে একেবারে ইচ্ছাকৃতও হয়তো বলা যাবে না। কিন্তু বড় পরিসরে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার সময় এ নিয়ে তারা ভাবতে পারতো। দুর্ভাগ্য এই যে, ইংরেজিভাষী কেউ এ বিষয়টি নিয়ে এই দিক থেকে এখনো প্রশ্ন তুলেছে বলেও শোনা যায়নি।

আমি লক্ষ্য করলে দেখি আমার সাতশ ‘ফ্রেন্ডের’ যে তালিকাটি ফেইসবুকে আছে তার মধ্যে দুই কি তিন জন আছে যারা আমার বাস্তব জীবনের বন্ধু। তাহলে এই ‘ফ্রেন্ড’ তালিকাটি আসলে কী? ফেইসবুকের এই ‘ফ্রেন্ড’ সার্কল আসলে শেষ বিচারে একটি ‘কমিউনিটি’; যাদের গ্রুপ শিরোনামে খাঁচাবদ্ধ করা হয়নি। আর ফেইসবুক নিজেও বিষয়টি একেবারে ভুলে বা এড়িয়ে যায়নি। যে কারণে এখানে ‘শেয়ার’ করা ‘কনটেন্ট’ সুনির্দিষ্ট সংখ্যক ‘ফ্রেন্ডের’ সঙ্গে ‘শেয়ারের’ বিকল্পও রেখেছে।

[২০১২ সালের মার্চ মাসে লেখা]

Advertisements

মন্তব্য?

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s