নিউ ইয়র্ক টাইমসে রবীন্দ্রনাথ :: নোবেল থেকে মরণ (প্রথম পর্ব)

আমেরিকা তখনো আমেরিকাই। আমেরিকানরা তখনো আমেরিকানই। সাধারণ আমেরিকানরা কেমন তা যেমন আমরা এখন জানি না, তখনো জানা যায়নি। তবে প্রাতিষ্ঠানিক আমেরিকা তখনো এখনকার মতোই। সেই আমেরিকা ‘পশ্চিম’ বলতে কী বুঝতো তা তাদেরই কেবল জানা সম্ভব ছিলো। আমাদের জন্য রয়ে গেছে শুধু সামান্য ইঙ্গিত।

তৃতীয় দুনিয়ার মানুষের কাছে উন্নত জীবনের যাপকই ‘পশ্চিম’। আমেরিকার কাছে আমেরিকাই ‘পশ্চিম’- খারাপ শোনালেও সত্যিটা হলো- আমেরিকার কাছে আমেরিকাই দুনিয়া। এখন যেমন, তখনো তেমন ছিলো। তাই আমেরিকার কাছে রবীন্দ্রনাথ ‘হিন্দু কবি’। আমেরিকার হিসেবে তিনি পশ্চিমে পুরোই অপরিচিত।

এই ‘হিন্দু কবি’ত্ব আর ‘পশ্চিমে পুরো অপরিচিত’ থাকার ঘটনা আমেরিকানদের জানায় সেখানকার বহুল প্রচারের দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমস।


নিউ ইয়র্ক টাইমসে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পাওয়ার খবর ছাপতে গিয়ে তার নাম babindranath ছাপা হওয়ার খবর তো পুরনো। তবু যারা রবীন্দ্রবেত্তা নন, তার জীবনী ঘেঁটে যারা তুখোড় নন, যারা তার ইংরেজি লেখক জীবন সম্পর্কে তেমন জানেন না- সেইসব পাঠকের জন্যে বিষয়টা জানিয়ে রাখাই মঙ্গল : ১৯১৩ সালের ১৪ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথের নোবেল পাওয়ার খবর ছাপে পত্রিকাটি। পুরস্কারটি এর ঠিক এক দিন আগে ঘোষণা করা হয় সুইডেনের স্টকহোমে। সেই খবরের শিরোনামেই অপমানের চমক নিয়ে আসে পত্রিকাটি। তারা শিরোনাম করলো ‘একজন হিন্দু কবিকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে’। তবে রবীন্দ্রনাথ যে হেলাফেলার পাত্র নন তা বোঝানোর জন্য শিরোনামের নিচেই পত্রিকাটি লিখে দিলো যে তার পরিবার ভারতের সবচেয়ে সম্মানিত পরিবারগুলোর একটি। তারপরই খবর শুরু, এবং সেখানেই আসল দুর্ঘটনা। লেখা হলো babindranath tagoreকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে। গুরুত্বের সঙ্গে বলা হলো যে এবারই প্রথম এমন কোনো মানুষকে পুরস্কারটি দেয়া হলো যার গায়ের রং শাদা নয়।

ঠিক পরদিন অর্থাৎ ১৫ নভেম্বর ছাপা হচ্ছে এই রকম কলাম : “সংকীর্ণতার কারণেই সম্ভবত, এবারের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পশ্চিমের সব গদ্য ও কবিতালেখককে বাদ দিয়ে একজন হিন্দু কবিকে, যার নাম উচ্চারণ করা কঠিন আর মনে রাখা আরো কঠিন, দেয়ায় আমাদের কেউ কেউ ক্ষুব্ধ হওয়ার চেয়ে বিস্মিতই হয়েছে বেশি। এটা হয়তো ঠিকই আছে, কিন্তু একটু কঠিন লাগে ব্যাপারটা, আর বিষয়টা আমাদের প্রচলিত ধারণার মধ্যে পড়ে না। নোবেল কমিটি ছাড়া আমাদের সবার ভেতরে ই টাকা আর গরিমা নিজের পরিবারে রেখে দেয়ার ধারনাটা খুব প্রবলভাবে প্রোথিত।
অনেক বৃটিশ সমালোচক বাবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় এমন প্রমাণ পেয়েছেন যাতে তাকে জীবিত সব কবির মধ্যে সবচেয়ে আত্মিক স্পৃহা সম্পন্ন বলে মনে হচ্ছে তাদের। পরীক্ষার জন্য তার লেখা এখন এখানেও পাওয়া যাচ্ছে। আত্মিক স্পৃহাই কি একজন কবিকে মহৎ করে? আর কিছু লাগে না? সূক্ষ্মতা, অন্তর্দৃষ্টি, সুষমা এবং সমকালকে বোঝার সমব্যাথি চোখÑ একজন কবিকে মহত্তর বলতে গেলে এসবও কি বিবেচনায় নেয়া উচিত না?
একজন হিন্দুকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেয়ায় হতাশ হওয়া সহজ। কারণ তাকে যে লেখার জন্য পুরস্কার দেয়া হয়েছে তার পুরোটাই অনুবাদ।”

পুরস্কার পাওয়ার খবর ছাপানোর নয় দিন পর ২৩ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বেশ বড় একটি লেখা ছাপা হলো পত্রিকাটির ম্যাগাজিন অংশে। এতে জানিয়ে দেয়া হলো যে নোবেল পাওয়া হিন্দু কবিটি নিজের দেশের বাইরে একেবারেই অপরিচিত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে নোবেল দেয়ার ঘোষণা যে মহাআশ্চর্যজনক এক খবর সেটা উল্লেখ করা হলো ওই লেখার শুরুতেই। তারপর বলা হলো তাকে পুরস্কারটা দেয়া মহা আশ্চর্যের এই কারণে যে এই লোক তো ইওরোপ ও আমেরিকাই পুরোই অপরিচিত।

পত্রিকাটি যখন এই বিশেষত্ব তুলে ধরছে তার আগের বছর দেড়েক ধরে ইওরোপে রবীন্দ্রনাথারে অবস্থাটা কী? ঠিক এর আগের বছরের জুন মাসে তার কবিতা প্রথম প্রকাশ হলো ইংল্যান্ডের দ্য সাময়িকীতে। জুলাইয়ে চারদিন- ১৩, ১৬, ২৬ ও ৩১ তারিখ- তার সম্পর্কে খবর ছাপা হলো টাইমসে। এরই মধ্যে নভেম্বরের এক তারিখ বেরুলো গীতাঞ্জলির ইন্ডিয়া সোসাইটির সেই সংস্করণ যা কিছুদিন পরই পুনর্মুদ্রণ করবে ম্যাকমিলান; এবং গীতাঞ্জলির জন্য তিনি পাবেন সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার। নভেম্বরের সাত তারিখে ইন্ডিয়া সোসাইটির গীতাঞ্জলির আলোচনা ছাপা হলো টাইমস সাহিত্য সাময়িকীতে। ওইদিনই বইটর আলোচনা ছাপা হলো The Westminster Gazette-এ। এরপর নভেম্বরের ১৬ তারিখে একই সঙ্গে বৃটিশ দুই পত্রিকা The Athenaeum I The Nation-এ বইটির আলোচনা ছাপা হলো। আর ১৯১৩ সালে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বৃটেনের নয়টি পত্রিকায় গীতাঞ্জলি নিয়ে আলোচনা হলো, রবীন্দ্রনাথের ইংল্যান্ড যাওয়ার খবর ও তার নাটক নিয়ে আলোচনা হলো। বৃটেনে যখন এতোকিছু হচ্ছে আমেরিকানরা তার কিছুই খবর রাখছে না তখন!

রবীন্দ্রনাথের নোবেল জয়ে- জয় শব্দটা পত্রিকাগুলোই ব্যবহার করছে- নোবেল কমিটির সমাচলোচনাও করছে পত্রিকাটি। তার নোবেল পাওয়ায় দুটি বিশেষত্বের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে : প্রথমত, রবীন্দ্রনাথ কবিতাগুলি লিখেছিলেন বাংলা ভাষায়, প্রাচ্যের চিন্তাভাবনা অনুযায়ী, মূলত প্রাচ্যেরই বিশাল পাঠকগোষ্ঠীর জন্য। দ্বিতীয়ত পরে সেগুলোকে ইংরৈজি ভাষায় ভাষান্তর করা হয়। এরপরই নোবেল কমিটির সমালোচনা করে বলা হচ্ছে : বাংলা ভাষায় কবির বৈদগ্ধ্য ও দক্ষতা বিবেচনা করেই তাকে নোবেল এ পুরস্কার দিতে নোবেল কমিটি। তবে ঘটনা সম্ভবত যেটা ঘটেছে সেটা এই যে তার কবিতার ইংরেজি ভাষান্তরের ওপর নির্ভর করেই তাকে পুরস্কারটি দেয়া হয়েছে। এরপর ওই প্রতিবেদনে রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক বেশকিছু তথ্য দিয়ে গোটাদশেক কবিতা পুনর্মুদ্রণ করা হয় তার The Gardener বইটি থেকে।

পশ্চিমে রবীন্দ্রনাথের অপরিচিতির খবর যখন গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করছে নিউ ইয়র্ক টাইমস তার ১১ মাস আগেই আমেরিকায় তার উপস্থিতির খবর প্রচার করেছে শিকাগোর শিকাগো ডেইলি ট্রিবিউন। পত্রিকাটি বলছে : ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাঙলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কবি ও সঙ্গীতবিদ, শিকাগোয় একটা সপ্তাহ কাটাবেন মিসেস উইলিয়াম ভন মুডির অতিথি হিসাবে।ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়সে পড়াশোনা করছে রবীনাথের ছেলে। গত এক মাস তিনি সেখানে আছেন। শিকাগোয় থাকবেন এক সপ্তাহ।’ এই খবরের শিরোনাম কী করছে পত্রিকাটি? “ঠাকুর, বাঙালি কবি ও সঙ্গীতবিদ এই শহরে” (Tagore, Bengal Poet and Musician in City) শিরোনামের খবরে একটা গুরুত্বপূর্ণ খবরও দিচ্ছে পত্রিকাটি : ‘তিনি ইওরোপের উদ্দেশ্যে গত জুনে ভারত ছাড়েন।’ পত্রিকাটি এও জানিয়ে দিচ্ছে যে কবিতাপত্রিকা পোয়েট্রির ডিসেম্বর [১৯১২ সালের ডিসেম্বরে] সংখ্যায় তার কবিতা ছাপা হয়েছে; এবং সেটাই তার আমেরিকায় প্রথম প্রকাশ। ২১ জানুয়ারি প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হচ্ছে, পরের সপ্তাহে রবীন্দ্রনাথ নিউ ইয়র্কে ফিরে যাবেন। সেখান থেকে যাবেন লন্ডন, তারপর ভারত।

এসব সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ নোবেল পাওয়ার ১০ দিন পর (২৩ নভেম্বর, ১৯১৩) নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে তিনি পশ্চিমে পুরোই অপরিচিত। অথচ বৃটেনের টাইমস বুক রিভিউতে রবীন্দ্রনাথের কোন বই নিয়ে আলোচনা ছাপা হলো তা ঠিকই জেনে যাচ্ছে পত্রিকাটি, জানাচ্ছে তার পাঠককেও; এবং তা ঘটছে নোবেল পাওয়ার পর; নোবেল পাওয়ার আগে পত্রিকাটি টের পেত না ইওরোপে কোথাও নতুন কোনো কবিকে নিয়ে কোনে আলোড়ন হচ্ছে কি-না!

নভেম্বরের ৩০ তারিখেই অবশ্য তাকে অখ্যাতির গহ্বর থেকে আমেরিকায় দাঁড় করানোর একটা চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ছাপা হচ্ছে এক আলোচনা যেখানে তাকে তুলনা করা হচ্ছে আমেরিকার মহান কবি ওয়াল্ট হুইটম্যানের সঙ্গে। বলা হচ্ছে পূর্ব আর পশ্চিম কখনো না মিলবে না। তবু এই কবিকে পড়তে গিয়ে মহত্বের দিক দিয়ে মনে পড়ে যায় আরেক মহৎ কবি ওয়াল্ট হুইটম্যানকে। রবীন্দ্রনাথারে দুটি কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে আলোচক বলছেন : তার কবিতায় মানুষের আত্মা নিরাবরণ হয়ে উন্মোচিত হয়; আর যখন তা ঘটে তখন সেই আত্মা না পুবের না পশ্চিমের; আর এই তো সেই মহান বাণী যা কবিতার পক্ষে পৌঁছে দেয়া সম্ভব।

তবে গোটা আমেরিকা তো আর নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো নয়। তাই দেখা যাচ্ছে ডিসেম্বরের ২ তারিখেই ছাপা হচ্ছে তাদের ওই প্রতিবেদনের প্রতিবাদ। জোসেফ কামার্লি নামের এক পাঠক পাঠাচ্ছেন সেই প্রতিবাদ। সেখানে তিনি কথা বলছেন রবীন্দ্রনাথের খ্যাতি নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের খ্যাতি (Rabindranath Tagore’s Fame) শিরোনামে সম্পাদক বরাবর লেখা ওই প্রতিবাদে পাঠকটি বলছেন : আপনার পত্রিকার ম্যাগাজিন বিভাগে একটা শিরোনাম দেখলাম। তাতে বলা হচ্ছে ভারতের বাংলার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার দেশের বাইরে অপরিচিত। আমি ঐকান্তিকভাবে আশা করি যে এটা একটা ছাপার ভুল। তার যথোচিত প্রতিভার মূল্যায়ন হিসাবে নোবেল পুরস্কার দেয়ার বহু আগেই ইওরোপের সাহিত্য ও দর্শনের জগত, বিশেষ করে ইংল্যান্ড ও জার্মানির, এই প্রতিভা সম্পর্কে জানত। ঠিকমতো বলতে গেলে আপনি বলতে পারেন যে তিনি এই আমেরিকায় অপরিচিত ছিলেন, আছেন, এবং থাকবেন।

Advertisements

2 thoughts on “নিউ ইয়র্ক টাইমসে রবীন্দ্রনাথ :: নোবেল থেকে মরণ (প্রথম পর্ব)

মন্তব্য?

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s