ক্যাশিয়ারের ডায়েরি থেকে

উত্সর্গ
শেষ পর্যন্ত সত্য এই যে পৃথিবীর
বেশিরভাগ মানুষ কবিতা পড়ে না।
সামান্য পাঠক, আর বিপুল অপাঠক-
এই দুইয়ের মাঝখানে দাড়িয়ে থাকে
কবি। তারও আবার জীবন আছে।
সেই জীবন, কবিতা এবং কবির
বোঝাপড়া সম্ভব? অসম্ভবপর সেই
বোঝাপড়ার একটা চেষ্টা ধরা রইলো।
এই কবিতার বইয়ে। যারা কবিতা
পড়েন তাদের জন্য। যারা কবিতা
পড়েন না তাদের জন্য।

প্রবেশক
পরিব্রাজকের মতো ধ্যান মুদ্রার নাই। মুদ্রা আরো বেশি পটু। যেখানে যত
পূর্ণতার সেতু, সব ভেঙে নিজেরে ছানে সে। অশরীরী জাদুর পটে তার উদ্ধত
বিরচন। ফুল ও মালার বিভাজন সেই রচে। মুদ্রা তার করপুটে রাখিল কি
ধ’রে অজানিত জগৎ-ভ্রমণ!

মুদ্রার প্রতারণায় আমরা পরাক্রমশীল পশরা। আমাদের প্ররোচনা পাখি হয়ে
উড়ে যেতে পারে। মুদ্রার মাঝারে নিস্তার নাই কারো। মুদ্রার প্রগাঢ়
উন্মোচন ধস মেলে দিতে পারে। মুদ্রা যুগের সংসারে প্রয়াত সব পার্থিব
খেল। অমিয় সম্ভাবনা সে পুড়ে দিলো ব্রোথেলচারীর হেঁশেলে। সেখানে
আশার বরষণ সম্ভব হতে পারে? চেনা যেতে পারে কণ্টকে আকীর্ণ
পরশপাথর? বয়সের বহরে সেখানে হতেও পারে কোনো ভুল?

শহরের শেষ শিশুরা কুঠুরির গ্যালারিতে খেলা করে। মুদ্রার আলোয়। সেই
আলো এইখানে ধ’সে পড়া দালানে দিশাহীন, ঊষর অন্তরীণ সব মরা।

ক্যাশিয়ার, তোমার ডায়েরিতে এইসব সত্যের উত্তর আজীবন অপ্রতুল।

১.১
মানুষের জন্য এমন হওয়ার কথা ছিলো না যে
কবিতা তার সঙ্গে কথা বলবে; কিন্তু দুনিয়ার আড়াল থেকে
কবিতা কোনো-না-কোনো দূত পাঠায়। আর সেই দূত
কবিতার কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়;
একইসঙ্গে ওইসব কথা কবিদের জন্যও উন্মুক্ত ক’রে রাখে।

দেখ মুদ্রা কেমন ঘিরে ধরছে আমাকেও; দেখ আমিও অবাক হই
তখন যেন! হাসি-মশকরায় গ্রহ বেতালা জলের ওপর; জলের সৃষ্টি যেমন ভাসে
প্রথম গ্রাসে যেমন ভাসে নিদারুণ এই ঠাট্টাপ্রবণ দূরভোলা ছলনা। কিন্তু না,
এই কথা শুরু হয় তোমাকে লিখতে চেয়ে অনেক অনেক দিনদিন পর
যেমন হয়, ঠিক তেমনি;

দেখ মুদ্রা কেমন যেন, কিভাবে ঘিরে ধরছে আমাকেও

১.২

কবিরা শুধু কবিতাকেই প্রার্থনা করে আর ভাবে
জীবনে যদি কবিতার সাহায্য পাওয়া যেত। কবিদের
তুমি জীবনের পথ দেখাও আর ব’লে দাও কবিতা
জীবনকে এবং জীবন কবিতাকে ধারণ করে। যারা
অদেখাকে বিশ্বাস করে আর কবিতাকে জীবনে
স্থাপন করে তারাই কবিতার তরফ থেকে
কবিতার দেখা পায় আর
কবিতা লিখতে পারে।

তাহলে বলো ঘুম আছে মুদ্রারও।
দূর থেকে দূরে, জাত থেকে জাতে, পাত থেকে প্রাণ, মাঝেমাঝে সেখানে ঝিম ভাঙে তার;
উপুড় হয়ে ব’সে পাহাড়কে কাছে টানে মুখ ক’রে থাকে আকাশেরই দিকে-

গাড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে তুমি হঠাৎ প’ড়ে যাও খাদে; সবাই বললো সাতজন
মারা গেছে, আহত তিন; তাহলে দেখ; মুদ্রা… কিভাবে… মুদ্রা আরেকটু
বেশি হ’লেই আমি বেঁচে যেতে পারতাম, নিজের গাড়ি নিজেরাই, তখন পতন অন্তত
খানিক দূরে

কেননা সতর্কতা, নিজের গাড়ি তো নিজেরাই তখন।

কিছুটা দূরে থেকে গেলেও যেতেই পারতাম হয়তো, হয়তো যেতাম, খাদে;

তাহলে, কী আশ্চর্য, দেখ, মুদ্রা ঘিরে ধ’রে ফেলছে কাকে!

#

শোকে নিস্তব্ধ চিতা দূরে দূরে ঘুরতে যাচ্ছে কাজ করতে চেয়ে। পাশে
ছায়া রাখা দূরতা; বন্ধুত্বও কিছু পড়েছে তাতে। সময় বড়ো বলবান-
কথা কটি মনে জেনে শোকস্তব্ধ চিতা আমাদের শীত-শীত ছায়া।
কাছে থেকে যেমন, তেমনি রাতেও; কোনো, কোনো নড়চড় নেই এর; তুমি
আসো ফিরে, তারপর দেখো তোমাকেও কেমন চিনে নেবে পুরনো বিরলতার
কোপে; তুমি আসো, আসো তুমি

দেখ মুদ্রা যেন কিভাবে,

১.৩

যারা কবিতাকে তাদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ ব’লে
বিশ্বাস করে না কবিতা তাদের হৃদয় বন্ধ ক’রে দিয়েছে
আর তাদের চোখ পৃথিবীর পর্দায় ঢেকে দিয়েছে।

… ভাবো তবে দোষটা কার। তীরে হ’লে তীরে,
ছুড়ে হ’লে ছুড়ে, যেভাবেই হোক পতন কিন্তু
আছি পাশেপাশে। নিরক্ষর নাকি! জীবনে ও প্লাবনে
নিরর্থকতার দাম আছে

মুচলেকায় পতন ঠেকে আগে- টিপছাপ;
আঙুল তো আছে?
ওই যেমন খাদে-পড়া-বাস ছুঁয়ে এলো মাটির কাগজ,
যেমন ছাপ দিয়ে এলো সাত মৃত্যুর

#

এখানে দাঁড়িয়ে একটু প্রতীক্ষা ক’রো তুমি;
বন্দুকের নল থেকে গুলি বেরিয়ে আসবার আগেই
পালিয়ে যেও দৌড়ে,- যে তোমাকে মারতে পারবে না
ওই যার গুলিটি যাবে ফসকে, মানে যার গুলিটি
এড়িয়ে পালাতে চাইছো তুমি- সেই-ই তোমাকে ভালোবেসে ফেলবে;

ভরাট লোহার ভেতর থেকে ছুটে আসবে সীসা,
ফুঁড়ে যাবে তোমাকে, যাবে ছুঁয়েও; এবং;
এবং নিয়েও যাবে প্রাণ, শূন্যে শূন্যে;-

গুলি যদি না করে একের পর এক,
তুমি যদি পালাতে না চাও ছুটে,
তোমার ভালোবাসার প্রাণ কী ক’রে
তুলে দেবে ওই হাতে,
কে খুবলে নিতে পারে এমন জান!

১.৪

কবি, তুমি কবিতার প্রার্থনা করো যা
তোমাকে এবং তোমার আগের কবিদের
দয়া করেছে। তাহলে আশা করা যায় তুমি কবিতা
লেখার প্রজ্ঞা অর্জন করতে পারবে।

সীসায় তোমার হৃদ গ’লে গেলো, আগুন ধ’রে গেলো বারুদে,
রক্ত ফেটে গেলো বুকে, প্রাণ ঝ’রে গেলো তোমার;
কী আশ্চর্য দেখ,
না যদি ছুঁড়তাম ওই সীসা, না-ই যদি ছুঁড়তাম ওই বারুদ!
কী ক’রে ওই প্রাণ আজ হতো আমার,
কী ক’রে এড়াতাম হাত থেকে হাতে? কী ক’রে,

১.৫

আর তখন তোমরা কবিতা নিয়ে অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছিলে।
তোমরা দেখেছিলে শুরুতেই মানুষ কবিতা নিয়ে
খারাপ কথা বলতো। প্রথমেই তারা বলতো, কবিতাটি তারা বোঝে নাই।

তোমরা তাদের বলেছিলে, বোঝার ব্যাপার নিয়ে কথা হবে
পরে। আগে তোমরা শুধু জানতে চেয়েছিলে কবিতাটি
তাদের ভালো লাগছিলো কি-না।

আর এরকম প্রশ্নে অনেকেই তোমাদের বলেছিলো যে
কবিতাটি তাদের ভালো লেগেছে। কিন্তু
কবিতাটি বুঝতে না-পারার দাবির নিচে তারা
পিষে মারছিলো তাদের ভালোলাগা।

এদিকে খানাখন্দ পার হয়ে স্বপ্ন দেখবার নিশানা
তাড়না খুব; সক্রোধ এই নেশায় পরান নেই কোনো,
বিভোরে শুধুশুধু প্রার্থনামাখা গলি, আহ্ চারণদার,
সময়ের নিশানায় ফেঁসে গেলে হুল, তল্লাটে তল্লাটে
মরণের ঈশায় তল্লা জেনে খুলে নিলে খুব অবগুণ্ঠনঢাল,
পেটানো পেশায় পেরেক ঢেলে সেঁটে গেলে নিস্তর বিকালে;
হ্রদে হ্রদে হৃদয়পদ্ম সান্ত¡না দিলে কেউ না, কাউকে না;
কয়টা কথা, প্রতিশ্রুতি, ভেঙে দিলে নিজের ভালোয় ভালোয়;
আড়ালে, আবডালে;

তোমাকে প্রতীক্ষা ক’রে কিছু বলতে চাইলে নিজের;
হা পরান, কে শোনে কার কথা! কার দায়
তোমাকে উগড়ে দিতে পড়েছে নিশানাচর,
তুমি একদিন, সেদিন ফিরে তো আসোনি; অপেক্ষায় চেয়ে,
বনে বনে আক্রোশ তোমাকে আপন ভেবে,
ডুবে গেলে পাটের জল, ভাসিয়েও উঠলে খড়ি,-

পণ্যসম্ভারে তুমি একা;

১.৬

আর কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তোমাদের মানুষদের
মনে হয়েছিলো যে কবিতা বস্তুটাকে আগে বুঝতে হয়। কিংবা
কবিতা বুঝবার মতো একটা কিছু ছিলো।

আর তোমাদের ওইএরকম ধারণা
জন্ম নেবার পেছনের কারণটি কি তোমরা
একেবারেই জানতে না? না, একেবারেই অজানা
ছিলো না তোমাদের। এর পেছনে ছিলো তোমাদের
আকাশ আর মাটির মাঝখানে সুদীর্ঘদিনের
কবিতা লেখালেখির আর তার চর্চার ধরনের প্রভাব।

আর তখন তোমাদের মধ্যে যারা
কবিতা বিষয়টি নিয়ে চর্চা করতো, আর যারা
বিদ্যায়তনে কবিতা বিষয়ে শিক্ষা দিত তারা সবাই,
ওই কবিতা বিষয়ে একটি ধারণা প্রচার করেছিলো।
তখন তারা মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছিলো যে
কবিতায় কিছু একটা বলা হয়, আর
কবিতার সারমর্ম থাকে। এবং কবিতায় যা
বলা হয়, তোমরা কবিরা নানা লেখালেখি
দিয়ে দেখিয়েছিলে যে তা উচ্চমানের
মহৎ কোনো কিছু।

আর বলেছিলে মানুষের নিত্যদিনের যে বেঁচে থাকা
তার সঙ্গে তার কোনো সংযোগ ছিলো না। ওই
বিদ্যায়তনগুলিতে মানুষেরা শিখিয়েছিলে যে
কবিতায় বলা কথাগুলি যদি নির্দিষ্ট কিছু
মাত্রাগণনার আওতায় না পড়তো
তবে তা কবিতা ছিলো না।

যেতে চাও যেতে চাও, যেতে যেতে তোমার নীরবতা, আহা তোমাকেই,
মেরে ফেলে; জানিয়ে দিলে, হত্যা হয়ে পত্রিকায় পাতায় পাতায়, কোলে কোলে, ঘুরে
ঘুরে, বেড়ায়-; জেনে ফেলতেছো যে সেখানে আমার শত্রুনির্মিত প্রতিক্ষাই শায়ক;
পাতাবাহারের দলবাঁধা বাহারি কিনতে-পাওয়া-গান; সুগন্ধ স্নেহ
তোমার না; চেহারায় চেহারায় মিল আছে;-

এখন যাওয়া, যাওয়াটাই; বড়ো কথা, বড়ো বড়ো কথা;
বিনাশস্ত্রে দেহলভ্য, শত্রুতে শত্রুতে ছাই; বিনয় পানিতে
তেরো ফোঁটা, আমার বন্ধু ধ্বংস হয়, শত্রুও হয়ে উঠছে;

১.৭

মানুষ তার শিক্ষার্থীদের কখনো বলে নাই যে তোমরা
এই পৃথিবীতে কবিতা নামের যে-বস্তুটির পাঠ নিচ্ছো,
কবিতা নামের যে-বস্তুটিকে নিজেদের উপলব্ধিতে,
অনুভবে ধারণ করতে চাইছো তা তোমাদের
জীবনে যাপনসহায়ক হবে। তা তোমাদের
সংকটে-আনন্দে-বিপদে সঙ্গ দিয়ে শক্তি দেবে।
সাহস যোগাবে। একাকিত্ব ঘোচাবে।

ওই যে, দেখি, আগুনের রঙ সবুজ হয়েছে, দাউ দাউ করো না;
তবে কিন্তু জ্বলে, আমি হাত তুলবো, তুলবো, এখনো তুমি,
তুলতে বলি আমাকে, আমিও তুলতেই কিন্তু চাই;
এতোই স্বপ্ন আমার; তোমাদেরই ব্রহ্মাণ্ড; তবু তুমি প্রাণে,
জানতেই চাও; কে দিয়েছে দিব্যি? কে দিয়েছে এমন স্বরাট!

==========================

ক্যাশিয়ারের ডায়েরি
প্রচ্ছদ :: মনিরুল ইসলাম
পৃষ্ঠা :: ৬৪
দাম :: ৳৮৫ (কমিশনে ৳৬৮)
প্রকাশক :: ঐতিহ্য

Advertisements

মন্তব্য?

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s