কবিতা :: পাঠকের ও কবির

[এই লেখাটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত locating latin american literature শিরোনামের আন্তর্জাতিক সেমিনারে পড়েছিলাম। ২৪-২৫ মে অনুষ্ঠিত সেমিনারটির দ্বিতীয় দিন শেষ সেশনে এটি পড়া হয়।]

কবিতার সর্বজনীন যাত্রায় কল্পনার ভূমিকা কতোটুকু? কবিতা লেখার ক্ষেত্রে কল্পনা জিনিসটার মূল্য কেমন?

নিজের কল্পজগতকে পাঠকের সামনে হাজির করে দেয়াটাও কি কবিতা? এখানে এই ‘নিজের’ শব্দটার দিকে একটু বিশেষভাবে নজর দেয়া উচিত। কবির ‘নিজের’ কল্পবাস্তবতা আর মানুষের কল্পবাস্তবতা তো এক জিনিস নয়। পৃথিবীর মানুষের প্রায় সবার একটি কল্পবাস্তবতার জগৎ থাকে। উল্টো দিকে কবিরও নিজস্ব একটি কল্পবাস্তবতার জগৎ থাকে; সেই জগতে কবি ব্যাথা পান, সেই জগতে কবি আনন্দিত হন, সেই জগতে কবি নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হন। কবি মানুষটা কবি বলেই তার সেই সমস্ত কথা আগ্রহোদ্দীপক ঢঙে লিখে ফেলতে পারেন।
আর এইখানেই ঘটে বিপদ, যা ঘটবার। সেই সমস্ত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ারাশিকেই কবিতা ভেবে ভুল করতে থাকেন কবিতার-মতো-বাক্য রচনায় সিদ্ধহস্ত-স্বল্প সিদ্ধহস্ত কবিরা। তারা মনে করেন এই জগতটাকে দেখবার অন্য একটা চোখ তারা পেয়েছেন; জগতের ঘটনাবলির অন্য আর এক প্রচ্ছন্ন মানে তাদের কাছে ধরা দিচ্ছে। এই মনে হওয়ার দৌলতে তারা তাদের ওই দ্যাখার ঘটনাটিকে মনে করেন কবিতার প্রক্রিয়া। মনে করেন তাদের ওই প্রতিক্রিয়াই কবিতা।

ঘটনার মূল সূত্র তো আসলে অন্য জায়গায়। তাদের ওই দ্যাখার মতা ঠিক থাকলেও ঠিক নেই তাদের দ্যাখা। তারা জানেন না কী দেখতে হয়। তারা জানেন না কিভাবে দেখতে হয়। দেখতে হয় মানুষের কল্পবাস্তবতাকে। দেখতে হয় মানুষের কল্পপ্রবণতার চোখ দিয়ে। নিজের কল্পবাস্তবতাকে দ্যাখার দরকার নেই। দরকার নেই নিজের চোখ দিয়ে দ্যাখার। মানুষের কল্পবাস্তবতাকে মানুষের চোখ দিয়ে দেখতে পারলে যে-প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় বা যে-প্রচ্ছন্ন বাস্তবতার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় তাকে কবিতার-মতো-বাক্যে প্রকাশ করতে পারলে তাই কবিতা।

নিজের সুখ-দুঃখ নিজের আনন্দ-বেদনাকে কবিতার-মতো-বাক্যের প্রলেপ দিয়ে সার্বজনীন ক’রে তুললেই তা কবিতা হয় না। নিজের চোখের বদলে মানুষের চোখ দিয়ে দেখতে না-পারার ব্যর্থ ফাঁকিটুকু ঠিকই ধরা পড়ে মনোজ্ঞ পাঠকের কাছে। নিজের কল্পজগতের অস্তিত্ব-অভিজ্ঞতা ফেনিয়ে ফেনিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে লিখে রাখা ওইসব কবিতার-মতো-বাক্য পাঠকের সামনে জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে কবির ছুড়ে দেয়া একটা মিথ্যার ডালি ছাড়া আর কিছু নয়। এই মিথ্যুকেরা কবিতায় নিজের বানানো নিজের সৃষ্ট কল্পনার কথা ব’লে যায় আজন্ম। তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় মানুষের কল্পনার, মানুষের ভালোবাসার, মানুষের অস্তিত্বের অসীম কল্পজগৎ।

কোন্ মানুষের কল্পনা? সেই মানুষ যারা কবিতা লেখালেখিতে জড়িত নন। শুধু যে লেখেন না তা-ই নয়, মানুষগুলো হয়তো কবিতা পড়েনও না।

মানুষ কি কবির মনের অনুভব জানার জন্য কবিতা পড়েন? আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতই হয়তো এই যে, ‘না’; কবির মনের অনুভব জানার জন্য মানুষ কবিতা পড়ে না। কিন্তু, এই উদ্দেশ্যে কবিতা পড়া হলেও কবির মনোভাবটুকু কি কোনোদিন জানা সম্ভব হয়ে উঠে মানুষের পক্ষে? এর উত্তরও ‘না’। যতোদিন না কবি স্বয়ং ব’লে দিচ্ছেন তার কবিতার উৎসমুহূর্তটুকু। আবার উৎসমুহূর্ত ব’লে দিলেও পাঠক কিন্তু কবিতা পড়ে ওই উৎসমুহূর্তের অনুভববিন্দুতে কিংবা ঘটনাপ্রবাহে গিয়ে পৌঁছতে পারেন না। তিনি নিজেরই কোনো এক মুহূর্তের ঘটনাবিন্দুতে দাঁড়িয়ে কবিতাটির মর্মানুভবটুকুকে সেখানে চ’লে বেড়াতে দেখেন।

মানুষ তার জীবনে এগোতে এগোতে ক্রমশ নানা মূল্যে জীবনকে বুঝে উঠতে থাকে। ভরপুর হয়ে উঠতে থাকে জীবনের নানা অভিজ্ঞতায়। সেই অভিজ্ঞতাই তার সব, তার সম্বল। জীবনের সেইসব অভিজ্ঞতাই মানুষকে দিয়ে কবিতা ভালো লাগিয়ে নেয়, খারাপ লাগিয়ে নেয়। অভিজ্ঞতার অভাবেও কবিতা মানুষের কাছ থেকে দূরে থেকে যায় কখনো-কখনো।

===============================================

মোহাম্মদ রফিকের কবিতায় যেভাবে বাংলাদেশের গ্রাম আসে আর কারো কবিতায় সেভাবে আসে না। ঠিক যেভাবে স্বতস্ফূর্তভাবে শামসুর রাহমানের কবিতায় আসতো শহুরে মানুষের বেদনা। এখানে স্বতস্ফূর্ত শব্দটি থেকে একটি প্রশ্নের সূচনা হতে পারে। যে-রফিক গ্রামে থাকেন না তার কবিতায় কী ক’রে স্বতস্ফূর্তভাবে গ্রাম আসতে পারে?

এর একটা ব্যাখ্যা এমন হতে পারে যে রফিকের কাব্যচিন্তার জগৎ গ্রামমুখী। গ্রামময়। শহরের ক্রমগ্রাসমান চরিত্রের ভেতরে দাঁড়িয়ে একদা গ্রামে থাকা রফিকের সৃজনকল্পনার জগৎ কেবলই গ্রামের দিকে তাকায়। অথবা ক্রমবিলীয়মান গ্রামের বিরল হতে থাকা চরিত্র-চেহারা রফিককে তাড়িত করে- এমনও হতে পারে। এ কারণেই কি তার কবিতায় এইসব শব্দ আসে? :
বুকে নিয়ে বলেশ্বর-পশুর মোহনা
ভাসতে-ভাসতে উঠে এল লোকটা ডাঙায়;
মেহেন্দিগঞ্জের হাট, চরবাইশার মাজার,

আধ-ভাঙা কণ্ঠস্বর, বৃষ্টি-মেঘ ভেজা পদশব্দ,
ঝাঁপ-টানা দোকানে-দোকানে আলু-পেঁয়াজের ফিসফাস,
যেন জোয়ারের ঘোলা জল হারিকেন আলো, ধোঁয়া,

মুখগুলো চেনা-চেনা, চুড়ির হাসির টুংটাং,
খড়-হোগলার চালা পিছলে স্যাঁৎলামদির জ্যোৎস্নায়
ছেনাল আঁচল ঠেলে খসে পড়ছে শব টুপটাপ;

লোকটার চোখের-বিন্দুতে থির বানিশান্ত গাঁও,
গঞ্জ-হাট, কাদা-জল ভেঙে সরু পথ, দু’পাশের
ধানক্ষেত, শ্যাওড়া-আগাছার ঝোপ; খোকা ফিরে এলি

বাপ-দাদা, অনাত্মীয় স্বজনের হিম স্পর্শ, ছায়া,
বেতঘুম, কাতর অশ্বের ক্ষুরধ্বনি, মৃত বাঘের পাঁজর,
মাংসপেশি; তবু কিন্তু লোকটার কাটেনি বিভ্রম;

শুধুমাত্র বুকে নিয়ে বলেশ্বর-পশুর মোহনা
ভাসতে-ভাসতে উঠে আসছে তীর খুঁড়ে একটি রাত;
হাঁটুতে মাটির দাগ, মাছ-শ্যাওলা আঁশটে কররেখা!
[আমার কেউ নয় :: বিষখালী সন্ধ্যা]

এখন, এই কবিতাটি আমার মতো শহুরে কবিতাপ্রয়াসীদের ভালো লাগবে কেন! আমরা “জোয়ারের ঘোলা জল” আর “হারিকেন আলো”র রূপ এককল্পে দেখেছি কখনো? কিংবা “গঞ্জ-হাট”? “কাদা-জল” ভাঙা “সরু পথ”? সেই পথের “দু’পাশের/ধানক্ষেত, শ্যাওড়া-আগাছার ঝোপ” দেখিনি? আমরা দেখিনি। আমার দেখি না। আমরা দেখে চলেছি ওয়ান স্টপ মল, সুপারস্টোর। তবু কবিতা যারা পড়ে তাদের মনের জোরে শেষ পর্যন্ত রফিকের এই কবিতা তার গ্রামসর্বস্ব নিয়ে তীব্র ঝাঁকুনিতে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়।

নিতান্ত পাঠের অভ্যাশের বশে যে-ভাষার যে-গড়নের যে-বিষয়ের কবিতা বাংলা ভাষার পাঠকেরা অনায়াসে পড়েন, পড়তে চান, সে-ভাষা সে-গড়ন সে-বিষয় রফিকের কবিতার নয়। তার সমসাময়িক অন্য কবিরা যেখানে আধুনিক রফিক সেখানে আধুনিকোত্তর। আধুনিকোত্তর এই অর্থে যে তার সমসাময়িকরা যখন আধুনিক মানুষের ব্যক্তিগত বিবমিষা-ক্রোধ-দুঃখে আক্রান্ত-তাড়িত তখন রফিক ঠিক সেরকম নন। তার বিবমিষা-ক্রোধ-দুঃখ আমাদের মতো তুচ্ছ শহুরেদের পেরিয়ে যায়। তার বিবমিষা-ক্রোধ-দুঃখ বাংলাদেশ নামের অস্তিত্বটির বিবমিষা-ক্রোধ-দুঃখ। এমনকি রফিকের কবিতায় যে-ব্যক্তিমানুষেরা কখনো কখনো মুখ দেখিয়ে যায় সেই ব্যক্তিমানুষগুলোও শহুরে মানুষ নয়। তারা ওই বিপুল বিশাল বাংলাদেশের গ্রামের।

==============================================
এই শতকের প্রথম দশকে আমার লেখালেখির শুরু। এই সময়ে এসে আমার মনে হয় বাংলা কবিতা একটা দুর্দিনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাদ দিয়ে যে-আধুনিক বাংলা কবিতা সেই আধুনিক বাংলা কবিতা এখন দুর্দিনে। একুশ শতকের প্রথম দশকের কবিতালিখিয়ে হিসেবে আমি পরম তাড়না বোধ করি আধুনিক বাংলা কবিতার ভাষা নিয়ে। চারপাশে যেসব কবিতা দেখতে পাই সেগুলির ভাষা কোনোভাবেই ত্রিশের দশকের কবিদের কবিতা থেকে পাওয়া ভাষার প্রলম্বন ছাড়া কিছু নয়।
আজ এই সময়ে এসে মনে হয় আমরা একটা কানাগলির শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছি; যেখানে কবির নিজের কল্পজগতের প্রকাশটিকেই মেনে নেয়া এবং ধ’রে নেয়া হচ্ছে কবিতা ব’লে। যেখানে বানিয়ে-বানিয়ে নিজের কথা বলাই কবিতার শেষ কথা। যেখানে কবিতা মানেই আত্মপ্রেমের মহোৎসব।

সেই আত্মপ্রেম যে-আত্মপ্রেম থেকে তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের নিতাই জানতে চেয়েছিলো “হায়, জীবন এতো ছোটো কেনে, এই ভুবনে”। নিতাইয়ের এই আপেমাখা প্রশ্নের পেছন-পেছন একটি চিন্তা চ’লে আসে মনে। মনে হয় মানুষের আয়ুর যে-ধারণা তার শেষবিন্দুই কি নিতাইয়ের জীবনের ওই ছোটোত্ব? উল্টোদিকে নিতাইয়ের আেেপর বহর দেখে তো এও মনে হয় যে ভুবন বস্তুটা বেশ বড়ো একটা কিছু! আসলে তার এই ভুবন হলো আমাদেরই এই জগৎ; যে-জগৎ আমাদের চোখে সার্বণিক দৃশ্যমান, যে-জগতের ধারণার সঙ্গে মহাবিশ্ব নামক একটা বস্তুও খানিকটা মিশে গেছে। কিন্তু নিতাই যে মানুষের আয়ুষ্কালকে জীবনের শেষবিন্দু ভেবে নেয় সেখানে আমাদের সামান্য আপত্তি জানানোর আছে। আমরা বলবো যে জীবন কেবলই একজন-মানুষের-আয়ুর-শেষবিন্দুতে বাঁধা পড়ে থাকে না।

নিতাই নিজের আয়ুকেই ‘জীবন’ মনে করে। ‘জীবন’কে ওইরকম নিতাইয়ের মতো ক’রে না ভাবলে আমরা দেখতে পাই যে জীবন ক্রমবিস্তারমান এবং ক্রমঘটমান একটি প্রণালী ছাড়া কিছুই নয়। আমাদের ‘জীবন’-এর ধারণা তখন আর আমাদের প্রত্যেকের একার জীবনযাপনের, একার ‘জীবনে’ সিদ্ধিলাভের, শীর্ষে ওঠার ‘জীবন’টুকুই হয়ে থাকে না। তখন আমরা আমাদের সমগ্র চারপাশ মিলে যে-প্রবহমান তৈরি-হয়ে-ওঠা এবং প্রবহমান সমগ্র মিলে যে-‘জীবন’ তার অস্তিত্ব অনুভব ক’রে উঠি। সেই ‘জীবন’-এর ধারণায় থেকে আমাদের মনে হয় যে ‘জীবন’-এর যে-চলতে থাকা, গড়ে ওঠা এবং ভেঙে যাওয়া এবং আবার চলতে থাকাÑ তারই অস্তিত্বের উদ্ভাসন মানুষের ‘জীবন’-এর সমস্ত ঘটনাবলি। যুগে-যুগে ‘জীবন’ এইভাবেই চলেছে। শুধু ভাঙা আর গড়া।

‘জীবন’ নামের যে-অস্তিত্বটির কথা আমরা ভাবছি তার অনেক গুণের একটি হলো অনির্ণেয়তা। কিংবা বলতে পারি অনিশ্চয়তা। এই ‘জীবন’ আমাদের কখনোই জানার সুযোগ দেয় না আমাদের সামনে কী আছে। আমরা কখনোই বুঝে উঠতে পারিনি সামনে ঠিক কী ঘটতে চলেছে। ‘জীবন’ তার অনির্ণেয়তার দাপটে আমাদের সবসময়ই অন্ধকারে রেখে গেছে, আমাদের সীমিত অর্থের যে-‘জীবন’- প্রত্যেকের নিজের জীবনের আয়ুকেই শেষ মনে করার যে-প্রবণতা- সেই ‘জীবন’ সম্পর্কেও।
আমাদের সীমিত অর্থের ‘জীবনে’ আমরা মুহুর্মুহু নানা অনুভবক্রিয়ার সম্মুখীন হই। সেইসব ক্রিয়া আমাদের কোন্ মানসিক অবস্থায় ঠেলে পাঠিয়ে দেবে কিংবা পৌঁছে দেবে সাদরে তা আমাদের প্রত্যেকের নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ছাড়া জানা হয়ে ওঠে না কখনোই। তাহলে প্রতি মুহূর্তের এই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ধাক্কা আমরা সামলাবো কিভাবে?

ঠিক এইখানে একটা কথা বলবার আছে। আমরা বলবো যে আমাদের মাঝেই কোনো কোনো মানুষের সেই মতা থাকে যারা একক জীবনের ধাক্কায় জন্ম নেয়া ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে মানুষের মুখের কথায় লিখে রেখে যেতে পারেন। তাদের আমরা বলি কবি। সেইসব লিখে রেখে যাওয়া কথা আমাদের বৃহৎ জীবনের কাছ থেকে আঘাত পাওয়ার মুহূর্তগুলোতে আমাদের একা ক’রে ছেড়ে না-দিয়ে সঙ্গে থেকে আগলে রাখে। রাখতে চায়। কিন্তু বৃহৎ জীবনের ভেতরে যে-মানুষগুলো বেঁচে থাকে তাদের ভাষা বারেবারে পাল্টায়। জীবন বারেবারে পাল্টায়। জীবনের সঙ্গেসঙ্গে জীবনের চাপেচাপে ভাষা পাল্টায়।

================================================

মোহাম্মদ রফিকের কবিতা কি সেই ভাষাবদলের ধরনের প্রয়োজনের কোনো সংকেত দেয় আমাদের মতো তরুণদের কাছে? কেবলই ভাষাকে বিবেচনা করলে এর উত্তর হয় ‘না’। কিন্তু ভাষার তো ধ‘রে রাখার কথা জীবনকে। জীবনেরই আধার হতে গিয়ে ভাষার রূপ বদলে যাওয়ার কথা জীবনের সাথেসাথে। যেমন রফিকের কবিতার ভাষারা। তার কবিতার ভাষা যে-ব্যক্তি যে-পরিবেশ-পরিপার্শ্বকে ধ’রে রাখে তুলে আনে তা সেই বাংলাদেশ যে-বাংলাদেশ শুধু কয়েকটা বিভাগীয় শহরে আটকে থাকে না। সেই বাংলাদেশ কোনো কোনো কবির প্রেমমত্ত গ্রামবাংলা মাত্র নয়। এই দিক দিয়ে রফিকের কবিতা আমাদের জন্য ইঙ্গিতময় :
তবু তো তুমি ফিরে এলে
জাল থেকে খুলে এক-একটা ইলিশ

তবু তো তুমি ফিরে এলে
যেন ছড়িয়ে রাখা হল পাটাতনে,

তবু তো তুমি ফিরে এলে
বড়শির আগায় গেঁথে-দেয়া পুঁটির ছাওপোনা

তবু তো তুমি ফিরে এলে
গজারের হা-মুখে যেন এক দৌড়ে ঢুকে যাবে,

তবু তো তুমি ফিরে এলে
যেন ওজনে কিছুটা কম পড়ে যাওয়ায়

তবু তো তুমি ফিরে এলে
একটি স্তূপ থেকে চালান হয়ে গেলে সৌরদাঁড়িপাল্লায়,

যা-হোক তবু তো তুমি ফেলে গেলে
বুড়িগঙ্গার ঘাট আছড়ে একটি বেমালুম ঢেউ

তবু তো তুমি ফেলে গেলে
একখ- পোড়া কাঠ অতলে তলিয়ে নিয়ে

তবু তো তুমি ফেলে গেলে
তড়িঘড়ি নাওয়ের গলুই পেঁচিয়ে হাওয়ার

তবু তো তুমি ফেলে গেলে
এক কণা বুদবুদ রওয়ানা হল বঙ্গোপসাগর
[এক কিশোরের জন্য শোকগাথা :: মাতি কিসকু]
তার কবিতা আমাদের বলে জীবনের তাগিদে কবিতার ভাষার বদলে যাওয়ার কথা; জীবনের চাপে কবিতার ভাষার বদলে যাওয়া অমোঘ। তার কবিতা থেকে আমরা ভাষাবদলের দিকে পা বাড়ানোর সাহস পেতে পারি।

==============================================

কিন্তু শেষ পর্যন্ত কবিতা তো পড়ে ব্যক্তিমানুষ। সেই ব্যাক্তিমানুষের মনোগঠন কি ভূমিকা রাখে না কবিতার আস্বাদনে?
বুকে নিয়ে বলেশ্বর-পশুর মোহনা
ভাসতে-ভাসতে উঠে এল লোকটা ডাঙায়;
মেহেন্দিগঞ্জের হাট, চরবাইশার মাজার,

আধ-ভাঙা কণ্ঠস্বর, বৃষ্টি-মেঘ ভেজা পদশব্দ,
ঝাঁপ-টানা দোকানে-দোকানে আলু-পেঁয়াজের ফিসফাস,
যেন জোয়ারের ঘোলা জল হারিকেন আলো, ধোঁয়া,

মুখগুলো চেনা-চেনা, চুড়ির হাসির টুংটাং,
খড়-হোগলার চালা পিছলে স্যাঁৎলামদির জ্যোৎস্নায়
ছেনাল আঁচল ঠেলে খসে পড়ছে শব টুপটাপ;

লোকটার চোখের-বিন্দুতে থির বানিশান্ত গাঁও,
গঞ্জ-হাট, কাদা-জল ভেঙে সরু পথ, দু’পাশের
ধানক্ষেত, শ্যাওড়া-আগাছার ঝোপ; খোকা ফিরে এলি

বাপ-দাদা, অনাত্মীয় স্বজনের হিম স্পর্শ, ছায়া,
বেতঘুম, কাতর অশ্বের ক্ষুরধ্বনি, মৃত বাঘের পাঁজর,
মাংসপেশি; তবু কিন্তু লোকটার কাটেনি বিভ্রম;

শুধুমাত্র বুকে নিয়ে বলেশ্বর-পশুর মোহনা
ভাসতে-ভাসতে উঠে আসছে তীর খুঁড়ে একটি রাত;
হাঁটুতে মাটির দাগ, মাছ-শ্যাওলা আঁশটে কররেখা!
[আমার কেউ নয়/বিষখালী সন্ধ্যা।]

এই কবিতাটি পড়েই এক বন্ধু বলেছিলেন যে কবিতার শব্দগুলো তার খুব বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছে। আর এক বন্ধু বললেন, ওই বন্ধুটি আসলে কবিতাটিতে চোখ বুলিয়ে গেছেন বলেই এমন মনে হয়েছে। সেই বন্ধুর মতে এই কবিতা গালে চড় পড়ার মতো; পেটে চর পড়ার মতো নয়। মানে কবিতাটি পড়লেই হঠাৎ একটা ধাক্কা লাগে তার। আর অখাদ্য বেশি খেলে পেটে চর পড়ে যায়। এই কবিতাটি অখাদ্য নয় বলে এটি বারবার পড়া যাবে; পেটে চর পড়বে না। এবং কবিতার বাঙালিয়ানা বাংলাদেশটাই যে কবিতাটির প্রাণ তা বন্ধুটি টের পান। এই যে দুই বন্ধুর দুই কবিতাপড়া এই-ই বোধহয় কবিতার শেষ কথা। যেখানে কবিতাই চূড়ান্ত। পাঠকের মনই চূড়ান্ত। কবি শুধু নির্মাণ শেষে অপেক্ষা করতে পারেন।

অপেক্ষা করতে থাকেন। তাকে অপেক্ষা করতেই হয়। সময়ের অপেক্ষা॥

Advertisements

মন্তব্য?

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s